Wednesday, December 28, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৭


শাহরুখ খান অভিনীত একটা সিনেমা বেরিয়ে ছিল আমাদের দেশে ২০০৪ সালে। নাম ‘ম্যায় হুঁ না’। একটা chase sequence ছিল এই সিনেমায়, যাতে আমাদের বাদশা খান কে দেখা গিয়েছিলো রিকশায় চেপে একটি SUV কে তাড়া করে দুষ্টু লোকেদের বেদম শিক্ষা দিচ্ছে। সে দৃশ্য দেখে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝে উঠেতে পারিনি তখন। ফারহা খান ঠিক কোন মানসিক অবস্থায় এই দৃশ্যের কল্পনা করেছিলেন সেটাও ভাববার চেষ্টা করেছিলাম। উত্তর পাইনি সাথে সাথে। উত্তর পেয়েছিলাম অনেক দিন পরে - দেশের বাইরে গিয়ে। ঢাকায় রিকশা চেঁপে। ধানমন্ডির রাইফেল স্কোয়ারের সামনে দিয়ে অগুনতি রিকশার একটিতে আমি সওয়ার আর আমাদের রিকশা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পেল্লাই পেল্লাই সব চার চাকার গাড়ি। আমার রিকশা চালক ভাই রাস্তা একটু ফাঁকা দেখলেই এমন গতিবেগ বাড়াচ্ছেন যে আমার জান পাখনা মেলে উড়ে যাবার জোগাড়। জীবনে কোনো দিন মোটর চালিত গাড়ির সাথে প্যাডেল করা রিকশার পাল্লা দেওয়ার স্পর্ধা দেখার প্রথম অবকাশ হয়েছিল আমার! ২০০৯ সাল অবধি আমি অপছন্দের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে যে বাক্য ব্যবহার করে বহুবার সুফল পেয়েছি, সেদিনও তার ব্যতিক্রম করিনি – ‘ভাইয়া একটু আস্তে চালান, আমার এখন বিয়ে হয়নি। বাসায় মা অপেক্ষা করছেন। ' কোনো কটু কথা না বলেও চমৎকার ফল পাওয়া যায় এই আবেদনে। ভাইয়া কথা শুনেছিলেন বৈকি। ফারহা খানের সাথে কোন দিন দেখা হলে নিশ্চই জিজ্ঞেস করবো ওনার এই রিকশা দিয়ে chase sequence'এর অনুপ্রেরণার কথা। তবে এখন এই রিকশা এডভেঞ্চার কিছুটা অভ্যাস হয়ে গেছে । মাঝে মধ্যে রিকশাচালক ভাই একটু রাস্তা ফাঁকা পেলে, আমি আর ওদের একটু সুখ করে প্যাডেল চালাতে মানা করি না।

ঢাকা শহর জুড়ে রয়েছে এরকম লাখ লাখ রিকশা। আবার পড়লেন? হ্যা, একদম ঠিক পড়েছেন - লক্ষ লক্ষ রিকশা।পৃথিবীর রিকশা রাজধানী এই শহর। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে মানুষের সব চেয়ে পছন্দের যান এই তিন চাকার বন্ধু। সারা শহর জুড়ে কোথাও লাইন করে, কোথাও লাইন কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সারি সারি রিক্সা সারা শহরের গতি সঞ্চার করে চলেছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ লক্ষ রিকশা রয়েছে যার প্রায় অর্ধেক রয়েছে দেশের রাজধানীতে। দিনে প্রায় ৭০ লক্ষ যাত্রী ব্যবহার করেন এই বাহন যা কিনা ঢাকার দৈনিক যাত্রী সংখ্যার ৭০%। গত শতকের ৩০'এর দশকে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রিকশা'কে আর আজকের দিনে সেই হলেন মধ্যবিত্তের যাতায়তের প্রথম পছন্দ। দেশের অর্থনীতিতে রিকশার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একবার এক সমীক্ষায় চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে - পরিবহন খাতে দেশের আয়ের দিক দিয়ে, বাংলাদেশের জাতীয় উড়ান সংস্থা বিমান বাংলাদেশের দ্বিগুন আয় হয় বাংলাদেশের সমস্ত রিকশার থেকে। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের জীবিকা হলো রিকশা চালানো।

এতো গুলো গরিব মানুষের অন্নদাতা এই রিকশা - সেটা যেমন ঠিক আবার এই বাহনের এই প্রচুর পরিমানে উপস্থিতি আমার মনে হয় ঢাকার গতিকে অনেক মন্থর করে দিয়েছে। এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দিয়েই ঢাকায় রিকশা চলাচল করে যেটা না করলে মোটর চালিত যান আরো দ্রুত গতিতে চলতে পারতো। গত ১২ বছরে অবশ্য অনেক জায়গায় রিকশা চলাচলে নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়েছে তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো যথেষ্ট নয়। যতদিন না কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করে রিকশার ব্যবহার কেবল মাত্র এলাকা ভিত্তিক করে এবং বড় রাস্তার নাগালের বাইরে না নিয়ে যাওয়া যায়, ঢাকার মাথা-ব্যাথা করা যান জট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে না। সময় বলে দেবে মেট্রো রেল চালু হলে এই পরিস্থিতির কি পরিবর্তন হবে। অপেক্ষা করতে হবে আরো তিন থেকে চার বছর।
এই রিকশায় বসে যাতায়ত করতে করতে আমার মনে অনেক সময় মজার, মজার সব কথা মনে আসে। ধরুন আপনি রিকশায় চেপে কোথাও যাচ্ছেন। খুব সকাল বা অনেক রাত্রি না হলে, যানজট অবধারিত। আপনি যাচ্ছেন, আপনার পাশ দিয়ে অগুনতি রিকশা যাচ্ছে। এক একটা মানুষ কে অনেক ক্ষণ ধরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন আপনি। কখনো আপনার রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে, বা কখনো পিছিয়ে পরছে। আসে পাশের মানুষ গুলো সব মোটামুটি একই। আমি ভাবি এই ভাবে পথে যেতে যেতে কখনো কেউ কারো প্রেমে পড়েনি !!! এরকম তো হতেই পারে। এক একটা সিগন্যাল পার হচ্ছে আর চোখাচুখি থেকে সেটা স্মিত হাসি, বা ঘুরে, ঘুরে বার,বার দেখায় বদলে যাচ্ছে। কখনো সেই প্রেম কাহিনী রাস্তার মোড়ে বাঁক নিয়ে হাড়িয়ে যাচ্ছে আর কেউ, কেউ গতি বাড়াচ্ছে সেই থেমে থাকা রাস্তার প্রেমে। হয় কি এরকম ! হয় নিশ্চই।

এমন সব লম্বা লম্বা দূরত্ব ঢাকায় রিকশা করে পার করা যায় আমাদের এখানে তা কল্পনার অতীত। মিছিলের মতো রিকশা চলছে শহর জুড়ে। একজনের ঠিক পিছনেই আরেকজনের রিকশা। কেউ কাউকে এক বিন্দু জায়গা ছাড়বে না। একই গতিতে, একই ছন্দে চলছে শয়ে, শয়ে রিকশা রাস্তার অনেকটা অংশ জুড়ে। একজন ব্রেক চাপলে, অনেক সময়ই পেছনের রিকশা এসে ধাক্কা মেরে দেয়। পায়ের কাছে যে কাঠের উঁচু অংশ টি থাকে রিকশায় - সেখানে পায়ের পাতা দিয়ে কি ভাবে চলন্ত রিকশায় দেহের ব্রেক চিপতে হয় - সেটা না জানলে - ছিটকে পরা, অবধারিত।

বাংলাদেশের রিকশা প্রস্থে একটু সরু হয়। আমাদের দেশের তুলনামূলক ভাবে চওড়া রিকশা আরো বেশি চওড়া হয়েছে গত কয়েক বছরে। আমি, আমার গিন্নি বসার পর, আমাদের পাঁচ বছরের মেয়ে এখনো আমাদের মাঝ খানে ভালো ভাবেই এঁটে যায়। ঢাকার রিকশায় তা কখনোই সম্ভব হবে না। আমাদের দুজনকেই বেশ কষ্ট করে বসতে হবে। তবে রিকশায় তৃতীয় কোনো পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে ঢাকায় এক মজার কায়দায় বসতে দেখেছি। আমরা পেছনে যেখানে হেলান দিয়ে বসি, তার ওপর চড়ে বসেন তৃতীয় মানুষ - যিনি আর বাকি দুজন সিটে বসার পর দুজনের দেহের মাঝখান দিয়ে একটা পা বের করে দেন আর আরেকজনের শরীরের পাশ দিয়ে অপর পা।
অধিকাংশ রিকশাকেই খুব যত্ন নিয়ে সাজানো হয়। রিকশার হুড গুলো কুলোর মতো বাঁকানো থাকে - এপারের রিকশার থেকে এই হুড গুলোই ওপারের রিকশা গুলোকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। আর আছে রিকশা জুড়ে আঁকা নকশা। রিকশার পেছনে লেখা থাকে নানা কথা । কোথাও ‘মায়ের দোয়া’ তো কোথাও শুধু মোবাইল নম্বর। চাইলে এই রিকশা যাত্রাকেও বেশ উপভোগ্য করে নেওয়া যায় । ফ্যাশন ইন মোশন , ইমোশনস ইন মোশন -আর থেমে গেলেই পেছন থেকে চালক বলে ওঠেন - টান দ্যান বা টান দে। সাথে গামছা দিয়ে ঘাম মোছা আর এগিয়ে চলা।

আর হ্যা - খালি রিকশা ধরবার জন্যে 'এই রিকশা' বলে ডাকলে চোখের সামনে দিয়ে রিকশাচালক ভ্রূক্ষেপ না করেই রিকশা হাঁকিয়ে চলে যাবেন । ডাকতে হবে - 'এই খালি'… (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ২৮.১২.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৬


নামের মানে জানতে চাইলে, আমি অনেককেই বিব্রত হতে দেখেছি। তবু নামের মানে জানার কৌতুহলের আমার শেষ নেই। কোনো নাম জানি অথচ তার মানে জানি না ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে। যেন তাকিয়ে আছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছিনা। সে মানুষই হোক বা কোনো স্থান। নামের মানে বা উৎস জানা'টা আমার কাছে খুব জরুরি মনে হয়।
যখন প্রথম ঢাকা শহরের নাম শুনেছিলাম, বেশ আশ্চর্য লেগে ছিল। এ আবার কেমন নাম ! ঢাকা মানে তো আচ্ছাদিত - কোনো কিছু কে ঢেকে রাখলেই না আমরা বলি ঢাকা। মজা লেগে ছিল। তারায় ঢাকা আকাশ আর তারই নিচে এক মস্ত শহর - যার নাম ঢাকা।
ঢাকা শহরের নাম করণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ বলেন সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়ি গঙ্গা নদীর তীরে ঘুরতে ঘুরতে, পাশের জঙ্গলে একটি দেবী দুর্গার মূর্তি খুঁজে পান এবং সেটিকে উনি মন্দির তৈরী করে প্রতিষ্ঠাও করেন। যেহেতু বিগ্রহটিকে গুপ্ত বা ঢাকা অবস্থায় পাওয়া যায়, তাই ওই মন্দিরের নাম করণ করা হয় ঢাকেশ্বরী মন্দির। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির, আর এই মন্দির থেকেই নাকি জায়গাটির নাম হয় ঢাকা। আমরা যাকে পলাশ ফুল হিসাবে চিনি তার আরেক নাম ঢাক ফুল। এই অঞ্চলে এক সময় প্রচুর ঢাক ফুলের গাছ ছিল আর সেই থেকেই, শোনা যায় শহরের নাম হয়েছিল ঢাকা। না এখানেই নামের ইতিহাস শেষ নয়। কারো কারো মতে ঢাকা নামের উৎস হলো আমাদের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ঢাক। এই ঢাক বাজিয়েই যেহেতু বাংলার রাজধানী হিসাবে এই শহরের আত্মপ্রকাশ, তাই নাকি এই শহরের নামকরণ হয় ঢাকা।

অনেক তো হলো ইতিহাসের কথা, নামের উৎসের কথা এবার শহরের বর্তমান অবস্থার কথা বলা যাক।

মস্ত বড় এক শহরের নাম হলো ঢাকা - প্রচুর চাপ সামলাতে গিয়ে কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু দমবার পাত্র সে মোটেই নয়। এগিয়ে চলাই তার পরম মন্ত্র আর উত্তরোত্তর নিজেকে উন্নত করার বিষয়ে ঢাকা শহর চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রত্যয়ী। তার প্রেমে না পরে থাকা যায় না। অন্য অনেক শহরের মতোই চরম বৈপরীত্যে ভরা সে। শহরে যেমন বাস করেন ধনীর ধনী মানুষ আবার তার সাথেই আছেন হতো দরিদ্র মানুষ। মধ্যবিত্ত মানুষ'তো আছেনই। প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়ের সামনে, গুলশান বা বারিধারার মতো জায়গায় যেমন চওড়া রাস্তা আছে, পুরোনো বা পুরান ঢাকায় তেমনই আছে অত্যন্ত সরু, সরু রাস্তা - গলি বলাই ভালো। ১০/২০ তলা ফ্লাট বা পেল্লাই বাংলো যেমন শহরের ঐশর্য্যের আভাস দেয়, সারি সারি ছেঁড়া ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছোট্ট ছোট্ট মাথা গোঁজার আস্তানা বুঝিয়ে দেয় প্রদীপের তলার অন্ধকার টা ঠিক কোন খানে।

বাংলাদেশে থাকলে আমার মাথায় একটা মজার তুলনা সব সময় চলতেই থাকে। কারণ'টা জানাই আছে। ভাষা - আমাদের অতি প্রিয় মাতৃভাষা। চারি পাশে সবাই বাংলায় কথা বলছেন, অথচ দেশটাই আলাদা। তাই যখন গুলশান, বারিধারা যাই, তখন আমাদের আলিপুর বা নিউ আলিপুরের কথা মনে পরে যায়, উত্তরা বা বসুন্ধরা আবাসিকে গেলে সল্ট লেক এর কথা আর শহরের মধ্যে থাকলে সেন্ট্রাল কলকাতার কথা মনে পড়তে থাকে। যদি ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট টা আরেকটু যত্ন করে করা যেত, 'ঢাকায় থাকি' বলতে আরো অনেক বেশি আনন্দ বোধ করতো ঢাকাবাসীরা। শহরের পরিসর অনুপাতে জনসংখ্যা এখানে অনেক, অনেক বেশি আর অত্যন্ত আশংকার বিষয় যে সেই অনুপাতে রাস্তা অত্যন্ত কম। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া হলো এখানকার মানুষের লম্বা গাড়ি প্রীতি। আমাদের দেশে যেমন ছোট মাপের ফ্যামিলি কার জনপ্রিয় হওয়ায় রাস্তায় অনেক কম জায়গা নিয়ে চলে এরা আর এতে পার্কিঙের জায়গাও লাগে কম। কোনো অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশে ছোট গাড়ির ব্যবহারে মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। রাস্তায় হাতে গোনা কিছু এদেশের মারুতি এসটিলো দেখতে পাওয়া যাবে - সে দেশের রাস্তা দাপিয়ে বেড়ায় টয়োটার বিভিন্ন মডেলের পেল্লাই সব বাহন । নতুন গাড়ির পাশাপাশি রিকন্ডিশনড গাড়ির মস্ত বড় বাজার হলো বাংলাদেশ। আজ এতো টুকুই থাক - পরের কিস্তিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আর ট্রাফিক নিয়ে আরো গল্প হবে। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১৮.১২.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।

Tuesday, October 18, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৫


প্রাচ্যের ভেনিস, পৃথিবীর রিকশা-রাজধানী, মসজিদের শহর ঢাকা কিন্তু বয়সে, অভিজ্ঞতায় আমাদের প্রিয় কলকাতার বড়দা। বড় অবশ্য সে বহরেও, জনসংখ্যায় আর জনঘনত্বে। কলকাতায় যেমন দেখতে পাওয়া যায় ব্রিটিশদের জোরদার প্রভাব, তেমন ঢাকায় রয়েছে মুঘলদের বেশ কিছু ছোঁয়া। বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের মতো শহরের বাইরে নয় বরং কলকাতার মতো শহরের গায়েই ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই মূল রাস্তা দিয়ে ডান দিকে এগোলেই পাওয়া যাবে ঢাকা'কে আর বাঁ দিকে গেলেই উত্তরা - আমাদের সল্টলেক'এর মতো পরিকল্পিত ও সম্প্রসারিত শহর।

নতুন নতুন জায়গায় যেতে আমার যেমন ভালো লাগে, তেমনি ভালো লাগে সে সব জায়গার ইতিহাস ভালো করে জানতে, বুঝতে। এ যেন কিছুটা আন্তরিক প্রেমের মতোই। প্রেয়সীর মেজাজ বুঝতে হলে, শুরু থেকে তার যাত্রার চড়াই-উৎরাই অংশ গুলোও জেনে নিতে হবে। আমার বোধ-বুদ্ধির বয়স যত বাড়ছে, ইতিহাসের প্রতি আগ্রহও তত বাড়ছে। আগে কেউ জাদুঘরে (মিউসিয়াম) যাবার প্রস্তাব দিলে মনে, মনে বেশ হতাশ হতাম, আর এখন নিজেই আগে থেকে জাদুঘর খুঁজি।
কলকাতা শহরের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় মোটামুটি সপ্তদশ শতকের (17th সেঞ্চুরি) শেষের দিক থেকে। জব চার্ণক কলিকাতা গ্রামে আসার পর। যদিও এই অঞ্চলে জনবসতির প্রমান পাওয়া গেছে নাকি প্রায় দুই হাজার বছর আগে থেকেই। সেদিক থেকে ঢাকার ইতিহাসের আভাস পাওয়া যায় কিন্তু আরো অনেক আগে। প্রথম শতক (1st সেঞ্চুরি) থেকেই এই অঞ্চলে শহুরে বসতি ছিল বলে জানা যায়। ঢাকা ছিল পুরোনো বিক্রমপুর জেলার অংশ যা কিনা ছিল আবার সেন সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। এর পরে ঢাকা চলে যায় মুঘল দের দখলে, ষোড়শ শতকের শেষের দিকে। তারা এই শহরকে বাংলার রাজধানী হিসাবে বেছে নেন ১৬০৮ সালে। কিছুদিনের জন্যে অবশ্য ঢাকার নাম হয়ে যায় জাহাঙ্গীরনগর। রাজধানীর প্রথম প্রশাসক, ইসলাম খান চিস্তী সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে এই নাম কারণ করেন এবং ওনার মৃত্যুর সাথে সাথে এই নামেরও মৃত্যু হয় - শহর ফিরে পায় তার পুরোনো নাম - ঢাকা।

মুঘল জমানায়, শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে ঘটে ঢাকার মূল সম্প্রসারণ। সমৃদ্ধি আর আভিজাত্যের সে ছিল এক অনন্য অধ্যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে তখন মুঘল বাংলার ঈর্ষণীয় কর্তৃত্ব। গোটা সাম্রাজ্যের জিডিপি'র ৫০% ই তখন বাংলার অবদান, যা ছিল একাধারে সারা পৃথিবীর জিডিপি'র ২৫% । সারা পৃথিবীর ব্যবসায়ীদের তখন ঢাকার দিকে নজর আর তাকে কেন্দ্র করে মস্ত কর্মযজ্ঞ। হবে নাই বা কেন ঢাকা তখন মসলিন কাপড় ব্যবসার প্রাণ ভ্রমর। সেই সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতকেও প্রায় আসি হাজার দক্ষ তাঁতি যুক্ত ছিলেন এই শিল্পের সাথে! সারা শহর জুড়ে ছিল বহু বাগান, বাজার, মসজিদ, মন্দির আর স্মৃতিস্তম্ভ!

অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে আবার এই শহরের হাত বদলের পালা এবং এইবার সেটা ব্রিটিশদের কাছে। যারা সুপরিকল্পিত ভাবে ঢাকার থেকে যত টুকু শুষে নেবার শুষে নিয়ে, তাকে ঠেলে দেয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। ব্রিটিশ শাসিত অখণ্ড ভারতে তখন কলকাতার উত্থানের পালা। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১৮.১০.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৪ (4)


বাংলাদেশ ছারা আর মাত্র তিনটি দেশের অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমি । ভারতকে ধরলে অবশ্য সংখ্যাটা দাঁড়াবে চার । তুলনামূলক ভাবে অনেক তাড়াতাড়ি কাজ মিটেছে সেসব দেশে। বিনীত পরামর্শ, হাতে সময় ও সঙ্গে অনেক ধৈর্য নিয়ে ইমিগ্রেশন'এর লাইনে দাঁড়াবেন ঢাকায়। কপাল ভালো না থাকলে, ১ থেকে দেড় ঘন্টা অনায়াসে লাগতে পারে। বেশির ভাগ ইমিগ্রেশন অফিসার'রাই বন্ধু সুলভ। সাধারণত ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট দেখলে ইংলিশ বা একটু নড়বড়ে হিন্দি'তে কথা বলা শুরু করেন আর বাংলাভাষী বুঝলে, প্রাণ খুলে কুশল বিনিময় করেন। এখনো সেই অফিসার'কে ভুলতে পারি না, যিনি আমরা বাংলাদেশে মধুচন্দ্রিমায় গেছি শুনে খুব বিস্মিত আর অসম্ভব আনন্দিত হয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন এই প্রথম কোনো ভিন দেশি দম্পতিকে দেখলেন বাংলাদেশে মধুচন্দ্রিমায় আসতে, বহু দেশি দম্পতিকে দেশের বাইরে যেতে দেখেছেন শুধু। বলেছিলেন, আবার আসবেন। না উনি জানতেন, না আমি জানতাম যে সিঙ্গল এন্ট্রি ভিসা নিয়ে আর কুলোতে পারবো না, মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা নিয়ে বার বার ছুটে যাবো বাংলা থেকে বাংলাদেশে।

যারা প্রথম বাংলাদেশে যাবেন, তাদের জন্য কিছু তথ্য এই সুযোগে জানিয়ে রাখি -
১. আপনার চেক ইন ব্যাগেজ এ Fragile ট্যাগ লাগাতে ভুলবেন না। ঢাকা বিমানবন্দরের ব্যাগেজ হ্যান্ডলার'রা অধিকাংশ সময়ই তাড়ায় থাকেন। ওনাদের কল্যানে আমার ব্যবহৃত সব Suitcase বা ব্যাগ গুলোরই করুন দশা - দেখলেই মনে হয় বহু লাঞ্ছিতা, নির্যাতিতা। Fragile ট্যাগ লাগানো সত্ত্বেও।
২. USD এক্সচেঞ্জ করে বাংলাদেশী টাকা পেতে হলে, বিমানবন্দর থেকে যতটা না করলেই নয়, ততটাই করুন । বাইরে তুলনামূলক ভাবে বেশি দর পাবেন।
৩. বিমানবন্দরের ভেতর থেকেই মোবাইল সিম কিনতে পারেন। ভয়েস কল ও ডেটার জন্য গ্রামীণফোন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসাবে অত্যন্ত নির্ভর যোগ্য। 3G ইন্টারনেট স্পিড খুবই ভালো। না, এই লাইন’টা লেখার জন্যে আমার গ্রামীনফোনের সাথে কোনো গোপন চুক্তি হয় নি।
৪. সুরায় আসক্তি থাকলে, ইমিগ্রেশন কাউন্টার-এ পৌঁছনোর আগেই ডিউটি ফ্রি শপ এ গিয়ে আপনার কোটার বিশেষ পানীয় সংগ্রহ করে নিতে পারেন। না হলে, শহরে চেনা বন্ধু না থাকলে, চড়া দামে আপনার তেষ্টা মেটাতে হবে, কোনো পাঁচ তারা হোটেল'এর Bar'এ বসে। ধর্মীয় বিধি নিষেধের কারণে সুরা (ওয়াইন) বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।
৫. আপনার বাঙাল ভাষার দক্ষতা পরখের প্রাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য ল্যাবরেটরি হিসাবে দয়া করে বাংলাদেশ কে বেছে নেবেন না। আপনার অজান্তেই আপনি কিন্তু হাসির খোরাকে পরিণত হবেন। CNG বা ট্যাক্সি ড্রাইভার'এর সাথে দরদাম করার সময় নিজের বিদেশী পরিচয় গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে স্থানীয় ভাবাতে গেলে ঠকে যাবেন। এরকম বহু বিচিত্র চেষ্টা আমি এপারের বাঙালিদের ওপারে গিয়ে করতে দেখেছি আর মনে, মনে খুব হেসেছি। 'হামি তুমাকে ভালোবাসসি', 'হামি মিষ্টি দই খাবে' বললেই যেমন কলকাতার বাঙালি হওয়া যায় না, ঠিক তেমনি বেসুরে ধ্রুপদী সংগীত গাওয়ার মতো সুর করে বাংলা বললেই সেটা ঢাকার স্থানীয় বাচনভঙ্গি বা অ্যাকসেন্ট হয়ে যায় না। গাড়ির চালক আপনার বিচিত্র চেষ্টা দেখে, দ্বিগুনের জায়গায় তিন গুন্ ভাড়া চেয়ে বসতে পারে । এই সুযোগে বলে রাখি, বাংলাদেশে তিন চাকার মোটর চালিত যান কে কেউ অটোরিকশা বলেন না। CNG চালিত রিক্সা ওখানে পরিচিত CNG নামেই।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই চোখে পরবেই পরবে এক অনিন্দ্য সুন্দর, মানুষের তৈরী kaleidoscope। দামি সুগন্ধি মেখে, হাল ফ্যাশনের জামা কাপড় পরে, লম্বা লম্বা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষারত কিছু বিত্তবান মানুষের সাথে অসংখ্য সাধারণ মানুষের ভিড়। গত সপ্তাহের হাটে বা মেলা থেকে কেনা নতুন হাফ প্যান্ট আর শার্ট পরে, ফুল ছাপ সালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় রঙ্গীন ওড়না দিয়ে কত ছোট ছোট বাচ্চারা অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় আব্বাজানের জন্যে বা আম্মার জন্যে। তাদের সঙ্গে তাদের আব্বু বা আম্মু অমোঘ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ওদের কাছের মানুষ গুলোকে সামনে থেকে দেখবেন বলে - কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর। এই আসার অপেক্ষার উত্তেজনাই আলাদা। আসা যাওয়ার মাঝে, ডিপার্চার এর থেকে এরাইভাল আমার অনেক বেশি প্রিয়। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ২৯.০৯.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।

Thursday, September 22, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ৩



বাঙালি কে? বাংলা যার মাতৃ ভাষা তিনি, নাকি যিনি বাংলাদেশের নাগরিক! এই ধন্দ সম্বন্ধে প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমার বাংলাদেশে গিয়ে। আমি বাঙালি বলে পরিচয় দিলে, অনেকেই এখনো আমাকে সংশোধন করে দেন - 'দাদা ইন্ডিয়ান বলেন, ও বুঝছি আপনি কলকাতার মানুষ'। বাংলাদেশী আর বাঙালি সেখানে সমার্থক। আমাদের মতো মানুষরা তাই ইন্ডিয়ান, কলকাতার মানুষ। অনেক পশ্চিমবঙ্গীয় বা ঘটির কাছে অবশ্য শুধু ওনারাই বাঙালি আর সব বাংলাদেশীই হলেন বাঙাল। আমার কাছে বাঙালি বলতে যেহেতু যে কোনো বাংলা ভাষী মানুষ, তাই আমার লেখায় বাঙালি লেখা থাকলে, তাঁকে আলাদা করে বাংলাদেশী হিসাবে ভাববার প্রয়োজন নেই। লক্ষ্য করেছি ভারতীয় শব্দ'টা বাংলাদেশে সেরকম বেশি ব্যবহার হয় না। অবশ্য ভারতের বাঙালিও আজকাল মিশ্র ভাষায় বেশি কথা বলার কারণে ভারতীয় শব্দটা একটু কম'ই ব্যবহার করেন। অথচ এই বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষীদের নিয়ে এই উপমহাদেশে কত যে আন্দোলন হয়েছে আর কত যে রক্ত ঝরেছে তার খবর জেনারেশন X, Y, Z এর অনেকেই রাখেন না।

কাঁটা তারের এ পাশের বাঙালিরা যারা কোনো দিন বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পান নি অথচ ভাবেন তিনি বাঙলিদের মজ্জায় মজ্জায় চেনেন, তাদের কে বলবো আবার ভেবে দেখতে। আসলে আপনি দেখেছেন, বাঙালিদের তিন ভাগের এক ভাগের বেশি কিছু মানুষ কে। বাকি অংশ কিন্তু বাস করেন কাঁটা তারের ওপারে, অন্য একটা দেশে। আস্ত একটা দেশ যার জন্ম হওয়ার প্রেক্ষাপটের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভাষা - বাংলা ভাষা।

ছোট বেলায় ইতিহাসে বঙ্গ ভঙ্গ সম্বন্ধে পড়েছি - পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্যে। না ছিল কোনো বোঝার পরিপক্কতা, না ছিল অনুধাবন করার সেই গভীরতা যে কত বড় সর্বনাশের বীজ সেই দিন বোনা হয়েছিল বঙ্গ ভঙ্গের নামে। একটা জাতির মেরুদন্ড কে দু'টুকরো করে সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে রাখার চক্রান্ত ছিল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। যার মূল্য এখনো চুকিয়ে চলেছে বাঙালি।

আর কিছু দিন পরেই আনুষ্ঠানিক ভাবে সারা পৃথিবীতে পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত হবে বাংলা হিসাবে। আমাদের অনেক ছোট বোন-ভাইয়েরাই হয়তো জানেন না বাংলা নামে যে বিশাল অঞ্চল অবিভক্ত ভারতবর্ষে ছিল তার অংশ ছিল বর্তমানের বিহার, ওডিশা, আসাম এবং অবশ্যই পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশ। পাহাড় থেকে সমুদ্র আর তার সাথে প্রকৃতির উজাড় করা প্রাকৃতিক সম্পদ - সার্থক অর্থেই সোনার বাংলা।

মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কত সৌভাগ্যবান যে আমার কাজ আমাকে আমার শিকড় চেনার সুযোগ করে দিয়েছে। এ সুযোগ অনেকেই পান না। খুব মন দিয়ে খেয়াল করে দেখেছি যে এপার আর ওপর বাংলার মানুষের মধ্যে কোথাও একটা ভুল বোঝা বুঝির চোরা স্রোত আছে। যে স্রোতের অভিমুখ পরিবর্তন দরকার নিজেদের কে ভালো করে চেনার আর জানার দিকে। আমার এই লেখা যদি সেই উদ্দেশে একটুকুও অবদান রাখতে পারে, নিজেকে ধন্য মনে করবো। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ২২.০৯.২০১৬

Friday, September 16, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ২


পাখির নজরে দুনিয়া দেখার মজাই আলাদা। সেই সুযোগ কি আর বার বার পাওয়া যায়। কিন্তু যখন পাই, আমি ভুলেও সেই সুযোগ ছাড়ি না। বিমান যাত্রায়, আমার বরাবরের পছন্দের বসবার জায়গা তাই ইমার্জেন্সি এক্সিট'এর উইন্ডো সিট। পা ছড়িয়ে বসে পাখির নজরে বিশ্ব দেখি। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ঠিক আধ ঘন্টা সময়। এই আধ ঘন্টার যাত্রার জন্য আগে পরের এতো সময় ব্যয়, বেশ বিরক্তিকর। অবশ্য পথে যত কষ্টই হোক না কেন, নিজের বাড়িতে যাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আমার কাছেও বাংলাদেশ যেন তাই আমার এক বাড়ি ছেড়ে, অন্য বাসায় যাওয়া। আক্ষরিক অর্থেই। আমাদের বাড়ি ও দেশে হয়ে যায় বাসা। এরকম আরো অনেক ভাষার মিল অমিলের গল্প শোনাবো পরে, অবশ্যই আপনাদের শোনার ধৈর্য থাকলে।
কোমরে সিটবেল্ট বেঁধে, সবাই যখন অবতরণের জন্যে প্রস্তুত, আকাশ থেকেই টের পাওয়া যায়, ঢাকা শহরে অনেক মানুষের বসবাস। অনেক আনন্দ ও উত্তেজনার ডালি সাজিয়ে সে অপেক্ষা করছে তার কাছের মানুষ আর দূরের মানুষদেরকে একসাথে বুকে টেনে তার আদরে আপন করে নিতে। আকাশ থেকে শহর দেখতে আর সেই শহরের চরিত্র নির্ধারণ করতে আমার দারুন লাগে। আর ভালো লাগে ওপর থেকে সেই শহরের মেজাজ বুঝতে। সেও কি সম্ভব? বিশ্বাস হচ্ছেনা? দূর্গা পুজোর সময় কলকাতা আসুন কোনো সন্ধ্যা বা রাতের উড়ানে, শহর জুড়ে আলোর মালা আগাম জানান দেবে, এখন উৎসব - এ পারে। ঈদ এর সময় ঢাকা গেলে, ফাঁকা রাস্তা দেখে, আকাশ থেকেই টের পাবেন, উৎসবের আনন্দ আর শুধু ঢাকা'তেই সীমাবদ্ধ নেই, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে ঢাকার যানজট খুবই কুখ্যাত - আধ ঘন্টার রাস্তা পার হতে অনেক সময় লেগে যায় আড়াই/তিন ঘন্টা, অনায়াসে। কিন্তু বছরে দু বার ঈদের সময় অনেকেই যখন উৎসবের উদযাপনে শহরের বাইরে চলে যান, জানজটহীন সেই রাজধানীর সে এক অন্য রূপ। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা'কেও টেক্কা দিতে পারে ঢাকা সেই সময়।
ঢাকা'র হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে, ২০১০ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। হজরত শাহজালাল ছিলেন এক বিখ্যাত সুফী পন্ডিত। ওঁনার জন্ম বর্তমানের তুরস্ক অর্থাৎ টার্কি'তে। মক্কা'তে উনি ওনার পাঠ শেষ করে ভারতে আসেন ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে। ভারতের নানান প্রান্তে ভ্রমণ করে উনি স্থায়ী হন শ্রীহট্টে অর্থাৎ সিলেটে যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ।
ঢাকা বিমানবন্দরের একটা বড় বৈশিষ্ট হলো - এর ব্যবহারকারীদের বৈচিত্র। সমাজের এতো শ্রেণীর মানুষকে একই ছাদের তলায় এক সাথে খুব কম'ই দেখতে পাওয়া যায়। উঁচু তলা থেকে একদম নিচু তলার মানুষ - সবাই কে পাওয়া যায় এই বিমানবন্দরে। অবাক হচ্ছেন? কারণ টা বলি। অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে অসংখ্য NGO’তে ভরা বাংলাদেশে বোধ হয় হতো দরিদ্র মানুষেরা থিক থিক করছে। এক বার গিয়ে দেখে আসুন - চোখ কপালে উঠলে, উঠতেও পারে। যাদের কাছে অর্থ আছে, সে যে কি পরিমানে আছে সেটা শুধু তাঁদের লাইফ স্টাইল দেখলেই টের পাওয়া যায়। মধ্যবিত্তের সংখ্যা সে অনুপাতে কম। এঁদেরকে অবশ্যই দেখতে পাওয়া যাবে বিমানবন্দরে। কেউ ব্যবসা বা অফিসের কাজে, কেউ বেড়াতে যাবার জন্যে বা কেউ চিকিৎসা করতে শহরের বা দেশের বাইরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ শুধু দেশের বাইরে যাচ্ছেন বাজার করতে। এবার বলি তাঁদের কথা, NGO'র পরিষেবা যাঁদের কাছে পৌঁছনোর কথা থাকলেও, পৌঁছয় না। সুলভ বললেও বেশি বলা হবে, অত্যন্ত সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার মস্ত বাজার হলো বাংলাদেশ। রুপোলি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে বেঁধে হাজারে হাজারে শ্রমিক দেশের বাইরে উড়ে যান প্রতি বছর - অনেকেই মধ্য প্রাচ্যে (মিডল ইস্ট) কেউ বা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে। ওঁদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আমার কেন জানিনা, খুব কষ্ট হয়। অজানা আশংকায় মন ভারী হয়ে ওঠে। ওঁদের দালাল, গন্তব্যে পোঁছলেই, পাসপোর্ট নিয়ে রেখে দেবে নিজের কাছে। প্রিয় জনদের মুখে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত তুলে দিতে আর অদেখা ভবিষ্যতের মায়াজাল বুনতে বুনতে ওঁরা প্রাণপাত করবেন। কখনো ন্যায্য মূল্যের কাছাকাছি মজুরি পাবেন, কখনো তাও পাবেন না। তবু আশায় বাঁচে চাষা। (ক্রমশ)
প্রতীক তরফদার । ১৫.০৯.২০১৬

Wednesday, September 14, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ১



আজকাল কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসলে, কথোপকথনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে বাংলাদেশ। কর্মসূত্রে আমার ঘন ঘন বাংলাদেশ যাত্রা, অবশ্যই এর অন্যতম কারণ আর তার সাথে রয়েছে একই ভাষায় কথা বলা মানুষদের আস্ত একটা দেশ নিয়ে নানান কৌতূহল। যারা আমার মতো জন্মসূত্রে বাঙাল অথচ কোনো সূত্রেই বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে ওঠেননি আর সেই ছোট্ট বেলা থেকে ও দেশ সম্বন্ধে গল্প শুনেছেন বিস্তর, তাঁদের আগ্রহ, ওঁদের কল্পনার তুলির ছবির সাথে আমার বাস্তবের অভিজ্ঞতা'কে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখা। দিনের শেষে বসে বা ছুটির আমেজ গায়ে মাখতে, মাখতে আমার অভিজ্ঞতা আরো অনেকের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ভাবনাটাকে আমল না দিয়ে তাই পারলামনা। দেখি ক'দিন চালাতে পারি এই আড্ডা।

যতবারই বাংলাদেশের বিমানে প্রবেশ করি, একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে। ছোট বেলায় দূর্গা পূজার সময় যখন দেশের বাড়ি যেতাম, খানিকটা সেরকম। দেবগ্রামের, তরফদার পাড়ায়, আমাদের বাড়ির দূর্গা মণ্ডপের সিঁড়িতে বসে থাকতেন ছোট ঠাকুরদা, বড় জ্যেঠু, সেজো জ্যেঠু, জ্যাঠতুতো, খুড়তোতো ভাই - বোনেরা - ট্রেনের সময় মিলিয়ে অপেক্ষা ঘরের মানুষদের আবার ঘরে খুঁজে পাওয়ার। সে এক অবর্ণনীয় উত্তেজনা। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের অত্যাধুনিক বানিয়েছে ঠিকই কিন্তু বেশ কিছু নির্মল উত্তেজনাকেও করে দিয়েছে মলিন। ঠিক সেই ছোট্ট বেলার উত্তেজনা এখনো টের পাই যতবার বাংলাদেশে যাই। ঠাকুরদা নেই, ঠাকুরদার ভিটে নেই, পরিচিত আত্মীয় স্বজন কেউ নেই - অথচ কি অমোঘ সেই 'বিচ্ছিন্ন' শিকড়ের টান।

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশে। তারপর যে কতবার গেছি আর ফিরেছি। ভিসার মেয়াদ দেখে, সময় মেপে থেকেছি। প্রত্যেক বার অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কাউন্টার এ গেলে বড়ো বিচিত্র লাগে - মনে হয় নিজের বাড়িতে বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার মতো। যে ভূখন্ডটা আমাদের সব্বার ছিল, কিছু মাতব্বর ধর্মের নাম দিয়ে মাঝ খানে কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করে দিলেন - আমাদের আর ওঁদের মধ্যে। সেই সব মাতব্বরদের কেউই আর আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চই চেষ্টা করতাম ওঁদের কাছে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করতে যে কত কর্তৃত্ব করার সুযোগ পেলে ওঁরা সাধারণ মানুষদের জীবন, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছেড়ে অন্য খেলায় মন দেবেন।

বাংলাদেশের জল-হাওয়ার এক বিরল গুন আছে - দূরের মানুষ কে কাছে টেনে নেওয়ার। সে দেশে না গেলে তার মাত্রা বোঝা যাবে না। তাদের আন্তরিকায় , আতিথেয়তায়, আপ্যায়নে চরম নিন্দুকেরাও খুঁত ধরতে পারবেন না। এমনি তার গভীরতা। ভারতের পর্যটন বিভাগের বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন 'অতিথি দেব ভব' অর্থাৎ অতিথি দেবতাতুল্য, সহজেই বাংলাদেশের পর্যটন বিভাগেরও ট্যাগ লাইন হতে পারতো। দেব - দেবীর উপাসকের সংখ্যা সে দেশে আনুপাতিক ভাবে যদিও অনেক কম কিন্তু সামগ্রিক অতিথি সেবা থেকে দেবত্বের অনুভূতি আসে অনায়াসে। ধর্ম - বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাংলাদেশী তাদের মনের উষ্ণতা দিয়ে মানুষকে এতটাই আপন করে নিতে জানেন যে, সেখানে আত্মীয়তা তৈরী হয় প্রতিটি মুহূর্তে। বাংলাদেশের সাথে ২০০৪ সালে তৈরী হওয়া আমার সেই আত্মীয়তা তাই আজও অমলিন - দিনে, দিনে শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যা কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১২.০৯.২০১৬