"প্রতীক,
হোটেলে পৌঁছে আমায় একটা ফোন
দিও।"
- আমার
উদ্দেশ্যে এই বাক্যটি ছুড়ে
দিয়ে দিনের শেষে, বিদায় বেলায়, নিজের ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পরলেন আমার
সহকর্মী। আমি তখনো হকচকিয়ে
প্রায় শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে
রয়েছি। মাথার মধ্যে বেশ কয়েকটা ভাবনা
একসাথে তাল পাকিয়ে যাচ্ছে।
ওর ফোন কি খারাপ
হয়ে গেছে! আমার থেকে ফোন
চাইছে কেন! আমার কাছে
তো কোনো অতিরিক্ত ফোন
নেই - আমি আজ সবেমাত্র
অন্য দেশে পৌঁছেছি ! ও
কি তাহলে আমায় হোটেলে ছেড়ে
আস্তে যাচ্ছে - না হলে হোটেলে
পৌঁছে ফোন দেবার কথা
বলছে কেন! সহকর্মীর ব্যাগ
গোছানো শেষ। সে মাথা
তুলে দ্যাখে, আমি তখনও তাকিয়ে
রয়েছি তার দিকে - আমার
মগজের একঝাঁক প্রশ্ন বোধহয় আমার মুখের অভিব্যাক্তিতেও
টের পাওয়া যাচ্ছে। কি বলবো বুঝতে
পারছি না! আর কেন
আমার থেকে ফোন চাইছে
তা তো অবশ্যই বুঝতে
পারছি না! আমায়
কিছুটা অপ্রস্তুত দেখে সেইই জিজ্ঞাসা
করলো, আমি কিছু বলতে
চাই কি না। আমি সসংকোচে জিজ্ঞাসা
করেই ফেললাম যে কেন সে
আমার কাছে ফোন চাইছে।
আমার প্রশ্ন শুনে সে বেজায়
ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
সে আবার কখন ফোন
চাইলো! আমি তাকে স্মরণ
করালাম - এই যে বললে
হোটেলে পৌঁছে ফোন দিও। সে দেখি অট্ট
হাসিতে ফেটে পড়লো - বেশ
একটা ROFL গোছের হাসি
আর বললো 'প্লিজ রিং মি আফটার
রিচিং ইওর হোটেল'।
সেই বুঝলাম, সারা জীবনের মতো
যে, আমরা ফোন করি
আর বাংলাদেশে ফোন বা কল দেওয়া
হয়। আমিও
আজকাল বাংলাদেশে গেলে অনায়াসে বন্ধু-বান্ধবদের থেকে ফোন চাই
মানে ঐ কল বা ফোন
দিতে বলি আর কি।
দুই
পাড়েই আমরা বাংলা ভাষায়
কথা বলি বটে কিন্তু
শুধু উচ্চারণগত পার্থক্যই নয় - ভাব প্রকাশের
ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পার্থক্য
নজরে আসে বাংলাদেশ গেলে। কখনো
কখনো এই ভাষার অমিলে
বেশ মজা লাগলেও, অনেক
সময়ে অসুবিধারও সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ থেকে
ভারতে এসে একই অনুভূতি
নিশ্চই আমাদের ওপারের বন্ধুদেরও হয়। এমনও হয়েছে
আমি কিছু প্রশ্ন শুনে
কি উত্তর দেব বুঝে উঠতে
পারিনি। বাড়িয়ে বলছি না এক
ফোঁটাও। ধরুন হঠাৎ কোনো
পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের কথোপকথন অবশ্যই শুরু হয় - কি
কেমন আছেন - আছো বা আছিস
দিয়ে। আগে বাংলাদেশ গেলে
যখন আমায় প্রথম সাক্ষাতে
জিজ্ঞেস করা হতো 'কি
অবস্থা?'। আমি
বেশ চিন্তায় পরে যেতাম যে
প্রশ্নকর্তা কোন 'অবস্থার' কথা
জানতে চাইছেন - দেশের-দশের নাকি ব্যবসা-বাণিজ্যের। পরে
বুঝলাম বাংলাদেশে 'কি অবস্থা' হল
বিলিতি 'হেই হোয়াটস আপ'
গোছের সাধারণ প্রশ্ন । উত্তরটা সাদামাটা
'এই তো ভাইয়া' বা
'এইতো ভাই' গোছের হলেই
হবে।
চলুন
এবার বাংলাদেশে দৈনন্দিন কথোপকথনে ব্যবহৃত কিছু ভিন্ন শব্দ
প্রয়োগের একটা ছোট্ট তালিকা
বানানো যাক। প্রথমে আমি
লিখবো এপার বাংলায় কি
শব্দ ব্যবহার হয় আর তারপর
লিখবো বাংলাদেশে ব্যবহৃত শব্দ।
বাড়ি = বাসা
নুন = লবন
লঙ্কা = মরিচ
স্নান = গোসল
বাচ্চা = বাবু
পুচকে = পিচ্চি
জল = পানি
লিকার চা =
লাল/রং চা
মাংস= গোশত
আরো অনেক আছে। এই মুহূর্তে এই কটাই মনে পড়লো। যারা পড়ছেন তারাও এই তালিকা'টি লম্বা বানাতে সাহায্য করতে পারেন।
এবার আরেকটা
মজার ঘটনা শোনাই আপনাদের । আমার প্রথম সস্ত্রীক ঢাকা ভ্রমণের সময় আমার বন্ধু আর তার স্ত্রী আমাদের নিয়ে দুপুর বেলা
খেতে বেড়িয়েছেন। রেস্তোরা থেকে ভরপেট কাচ্চি বিরিয়ানি-বোরহানী (বোরহানী টক দই দিয়ে তৈরী, হজমে সাহায্যকারী
পানীয় বিশেষ) খেয়ে বেরোনোর পর হঠাৎ আমার বন্ধু-পত্নীর ইচ্ছে হলো তিনি আমাদের ঢাকার
'লাচ্ছি' খাওয়াবেন। খাদ্যরসিক আমি জীবনে বহু কিছু খেয়েছি কিন্তু এই নামের কোনো খাদ্য
খাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার - আমার গিন্নিও ইশারায় বোঝালেন যে সেও খায়নি কোনো দিন এই লাচ্ছি
নামের কোনো খাবার। উনি যতই লাচ্ছি খাওয়াবার
আগ্রহ দেখান, আমরা ততই মৃদু ভাবে এড়াবার চেষ্টা করি কারণ লাচ্ছা পরোটার কোনো তুতো ভাই বোন গোছের খাবার জন্য সত্যি কোনো জায়গা বেঁচে নেই পেটে।ভর্তি পেটের প্রতিবাদ'কে উনি কোনো মতেই পাত্তা না দিয়ে বললেন 'এক গ্লাস লাচ্ছি
খেলে কোনো অসুবিধে হবে না দাদা'। সেই বুঝলাম
যে না এ কোনো খাদ্য নয়, এটি হলো পানীয়। অবশেষে
রাজি হলাম। চার জনের জন্যে চার গ্লাস 'লাচ্ছি'
বানাতে বলা হলো। নতুন কোনো পানীয় পান করার
আশায় বেশ খুশি মনে অপেক্ষা করছি। দেখি আমাদের পানীয় পরিবেশক চারটি গ্লাসে অতি পরিচিত
এবং ছোট বেলা থেকে অগুনতি বার পান করা 'লস্যি' এনে হাজির করলেন। এক বারের জন্যেও আমাদের
খেয়াল হয়নি যে উচ্চারণগত পার্থক্যের জন্য আমাদের চেনা খাদ্য-পানীয় এতটা অচেনা লাগতে
পারে!
আমাদের
যেমন কলকাতা থেকে কলকাতার বাইরে
বেরোলে ভাষার চলন-বলন সব
কিছুই বদলাতে থাকে, বাংলাদেশেও তার কোনো ব্যতিক্রম
নেই। উত্তর কলকাতা বা দক্ষিণ কলকাতার
বাংলার মধ্যে হয়তো ততটা পার্থক্য
নজরে আসবে না যতটা
পার্থক্য নজরে আসবে পুরান
ঢাকা বা ঢাকার নতুন
তৈরী হওয়া অংশের বাংলার
প্রয়োগে। আর ঢাকার বাইরের
বেশ কিছু অংশের ভাষা
এতটাই আলাদা যে সেগুলোর এক
বর্ণ আমি কেন ঢাকার
অনেক মানুষও বুঝতে পারেন না। হ্যা
ঠিকই পড়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষার কথা বলা যেতে
পারে। এক
বার ট্রেইন'এ চেপে ঢাকা
থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছি। আমার পেছনের সিটে
বসা দুই ভদ্রলোক নিজেদের
মধ্যে কথা বলছিলেন - আমার
মনে হলো পৃথিবী বিখ্যাত মোবাইল পরিষেবা সংস্থা ভোডাফোনের বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় চরিত্র জুজু (ZOOZOO) রা নিজেদের
মধ্যে ওদের বিখ্যাত অবোধ্য ভাষায় আড্ডা মারছেন। একটা
বর্ণ বুঝিনি আমি - হ্যা বুঝতে পেরেছিলাম
কিছু ইংরেজি শব্দ আর মাত্র
একটা বাংলা শব্দ - ঢাকা।
বাংলাদেশে যখন বাংলা খবরের কাগজ পড়ি, সেখানেও খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটু অন্য ধাঁচের ভাষার বাঁধন নজরে আসে। এই
মুহূর্তে একটা ব্যবহার খুব
মনে পড়ছে - 'ঘোষণা দিয়েছেন'। এপারে ঘোষণা করা হয় আর
ওপারে দেওয়া হয়। ছোট্ট
উদাহরণ - 'ক' পার্টির কার্য্য
নির্বাহী সম্পাদক 'খ' আগামী কাল
থেকে অনির্দিষ্টকালের হরতালের ঘোষণা দিয়েছেন। এই বিষয়েও বাংলার
দু পারে আশ্চর্য্য মিল
খুঁজে পাই - এ পারে সর্বাত্মক
বন্ধের ডাক ও পাড়ের
সর্বাত্মক হরতালের ঘোষণায় কেমন নিখুঁত ভাবে
মিলে মিশে একাকার হয়ে
যায়। প্রতিবাদের যেন ওই একটি
ভাষাই জানা আছে বাঙালিদের
– কি এপারে, কি ওপারে! আশার কথা - দুপাড়েই
মানুষ এই জনজীবন স্তব্ধ
করে দেওয়ার রাজনীতিতে চরম বিরক্ত এবং
এপারের মতো ওপারেও আজকাল
তত সারা মেলে না
এই উন্নয়ন-বিরোধী কার্যক্রমে।
বাংলাদেশে বারবার
যাবার সুযোগ পেয়ে আমি আমার প্রিয় মাতৃ ভাষাকে আরো নতুন নতুন আঙ্গিকে জানার ও বোঝার
সুযোগ পেয়ে যাই অনায়াসেই। আমায় কোনো বাংলা
সাহিত্যের ইতিহাস পড়তে হয়না - শুধু মনের জানালা গুলোকে খুলে রাখলেই যথেষ্ট। কত নতুন
কিছুই যে অবলিলায় শিখতে পারি, বলে শেষ করা যাবে না। এই ভাষাগত নানান অনুভূতি নিয়ে নয় আরো একটা বা একের
বেশি কিস্তি লেখা যাবে ভবিষ্যতে। (ক্রমশ)
প্রতীক তরফদার । ১০.০১.২০১৭
*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।
