Friday, September 1, 2017

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ৯



গত কয়েক মাসে বেশ অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন বা মৃদু অভিযোগ এসেছে যে ‘এক বাঙালের বাংলাদেশ'এর কি হল!!! দায়ি করব আমার ব্যস্ততা আর কিছুটা কুঁড়েমিকেই । আমি অবাক হয়েছি যে আমার এই ব্লগ এতো মানুষ মন দিয়ে পড়েছেন আর ভালবেসেছেন! সত্যি বলতে কি যত না বেশি অবাক হয়েছি, আনন্দিত হয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই আবার যাত্রা শুরু, দেখি কত দিন টানা যায়। একটা ধারাবাহিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করবো। শেষ কিস্তির খেই ধরেই লেখা শুরু করলাম। 

সতের কোটি বাংলাভাষী মানুষের দেশ, বাংলাদেশ। এদেশের জন্মের পেছনে কিন্তু একটা অন্যতম কারণ ছিল ভাষা। বাংলা ভাষা। আর সেই বাংলাদেশের  অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে যখন আমার প্রথম আলাপ হয়, কেন জানিনা আমার কানে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। আমার চার পাশে এতো  বাংলাভাষী মানুষ কিন্তু তাদের প্রথম পরিচয় অর্থাৎ তাদের নাম  - তাতে আর যাই থাক বাংলার ছোয়া খুঁজে পাই না! আমরা যারা কলকাতার আসে পাশে বড় হয়েছি, তারা মূলত বাংলা নাম শুনেই অভ্যস্ত - প্রশান্ত, প্রফুল্ল, অঞ্জন, কৌশিক, তিলোত্তমা, চন্দ্রিমা, কত যে বৈচিত্র - সবই বাংলা শব্দ। বাংলাদেশের নাম গুলো কিন্তু বেশির ভাগই হয় আরবি, ফার্সি নয় উর্দু  সুন্দর, সুন্দর সব শব্দ যার অধিকাংশরই মানে আমার জানা নেই। নাম গুলোর সঙ্গে তাই একাত্ম হতে একটু সময় লাগে আমার। হতে পারে আমার  হিন্দু অধ্যুষিত  অঞ্চলে বড় হওয়ার প্রভাব।বাংলাভাষী  সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে -বাংলা নাম রাখার প্রবণতা প্রায় নেই বললেই চলে - সে পারে হোক কি পারে। এই আমিই যদি  মালদহ বা মুর্শিদাবাদে অনেক মুসলমান ধর্মাবলম্বি মানুষের মধ্যে থেকে বড় হতাম, সে ক্ষেত্রে হয়তো বিষয় টা অন্য রকমের হতো। 

বাংলাদেশী সংখ্যাগুরু মানুষদের নামে মূলত  থাকে দুটি বা তিনটি অংশ। দুটো অংশের নামের একটা ছোট্ট  উদাহরণ দেওয়া যাক – ‘ইরফান হক’।  এই নামের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে একটা -বাংলা শব্দ বা কোন  বাংলা শব্দ।  ধরে নেওয়া যাকইরফান হক ইসলাম’ বাইরফান হক প্রান্ত। অধিকাংশ মানুষই -বাংলা নামেই বেশি পরিচিত - ধরা যাক 'সেলিম ভায়া (ভাইয়া)' আবার কেউ কেউ তাঁদের নামের বাংলা অংশটা ব্যবহার করতে ভালবাসেন। ্কারো নাম স্বপন বা বৈশাখী শুনে আপনি যেই ভাবছেন 'নমস্কার' বলে অভিবাদন করবেন, উনি আপনাকে ্সম্পুর্ন অবাক করে দিয়ে বলতে পারেন 'আদাব' বাংলাদেশের এই অভিবাদন জানাবার অভ্যাসটা আমাকে খুব আকর্ষণ করে। দেশে এটা খুব নিয়মিত। এমন নয় যে কেবল বিশেষ মানুষ হলেই তিনি অভিবাদিত হবেন বা সেলাম পাবেন। সে দেশে দেখা হলেই হয় 'আসসালাম ওয়ালাইকুম' বা 'নমস্কার' বিনিময় হবেই। সালামের শব্দ পরিবর্তন হয় মানুষের ধর্ম হিসেব করে।আসসালাম ওয়ালাইকুম' বানমস্কার সাধারণত মুসলমান বা হিন্দুদের নিজ নিজ ধর্মাবলম্বি মানুষদের মধ্যে বেশি ব্যবহার হয় - আর সেটাই যখন দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে হয়, শব্দটা বদলে গিয়ে হয়, ‘আদাব’। এরকম ভাবার কোন কারণ নেই যে এর ব্যতিক্রম নেই।  'আসসালাম ওয়ালাইকুম' শব্দবন্ধ'টা যদিও বাংলা নয় কিন্তু এর অর্থটা আমার খুব প্রিয় - 'আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক'।   

শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কি বা আসে যায়। আসে যায় বোধ হয় - নাম দিয়েই তো বোঝা যায় মানুষের 'ধর্ম'।না আমি ধর্ম বলতে নিয়ম, নীতির কথা বলছি না। ধর্ম মানুষের সেই পরিচয় ,যা কিনা মানুষ কে মান আর হুঁশের আগেও  হয় হিন্দু , মুসলমান , শিখ  বা খ্রিষ্টান  বানিয়েছেবাংলাদেশে গিয়ে আমার প্রথম উপলব্ধিয়েছিল যে ভাষারও বোধ হয় ধর্মান্তকরণ করা যায়আর সেই কারণেই হিন্দুরা  যে পানীয়কে  জল  বলেন, মুসলমানেরা  তাকে  বলেন  পানি। হিন্দু বড় ভাই  দাদা হলেও  মুসলমান  বড় ভাই  হয়ে যায় ভাইয়া। পশ্চিম্বঙ্গেও বাংলাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার এপারের মূল ধারার চেয়ে কিছুটা আলাদা।

আমার ভাবতে কেমন  অদ্ভুত লাগে শুধু  ধর্ম ভেদে  একই  ভাষায়  সম্পর্কের  নাম গুলো কেমন  বদলে  যায় - কিছু উদাহরণ দিলাম নীচে -

বৌদি - ভাবি
দিদি - আপা
জামাইবাবু - দুলাভাই
মাসি - খালা
মেসো - খালু 
মাসতুতো - খালাতো 
পিসি - ফুপু 
পিসা - ফুপা
পিস্ততো - ফুপাতো
কাকা - চাচা
কাকী - চাচী
খুড়তুতো - চাচাতো 
ঠাকুমা - দাদি
ঠাকুরদা - দাদা
দিদা - নানী
দাদু - নানা

শুধু সম্পর্কই নয়, আরো অনেক শব্দই বোধ হয় ধর্মের হাত ধরে বা আঞ্চলিক প্রভাবে সে দেশে অন্য ভাবে পরিচিত। গত কিস্তিতে কিছু নমুনা দিয়েছিলাম আর এই কিস্তিতে জুড়েদিলাম আরো কিছু। 

জলখাবার তো বেশ সুন্দর বাংলা। বাংলাদেশে কিন্তু ওটা নাস্তা।আর বাংলাদেশে কিন্তু আপনাকে নিমন্ত্রণ করা হবে না। দেওয়া হবে দাওয়াত ।সে দেশে মৃত্যু হয় নাহয় ইন্তেকাল। সে দেশে উনুন জ্বলে নাওখানে জ্বলে চুলা।এই তালিকা কিন্তু বেশ লম্বা। অত সহজে শেষ হবার নয়।শুধু বাচনভঙ্গির বৈচিত্রেই নয়শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বাংলা স্বতন্ত্র। 

আমার কিছু বন্ধুরা হয়তো বা আমার সাথে  দ্বিমত  পোষণ  করবেন। পৃথিবীর প্রতিটি  ভাষাই  তো এগিয়ে  চলেছে নিয়মিত ভাঙা  আর গড়ার মধ্যে দিয়েই।বিদেশী প্রচুর শব্দই  আমাদের  ভাষাকে অতীতে  সমৃদ্ধ করেছে আর বর্তমানেও করে চলেছে।কিন্তু কেন জানি না তাও  আমার এই এপার বাংলার  কান আজও অনেক সময় বাংলাদেশের বাংলা কে বুঝতে সময় নিয়ে ফেলে ! 

ভাবতেও ভালো লাগে যে আমার মাতৃ ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা তিরিশ কোটিরও বেশি।  সামগ্রিক ভাষা ব্যবহারের দিক দিয়ে পৃথিবীতে বাংলার স্থান সপ্তমে।  এই ভাষাতেই রচিত হয়েছে দুটি দেশে জাতীয় সংগীত (জন গণ মন অধিনায়ক এবং আমার সোনার বাংলা ) একটি দেশের জাতীয় স্তোত্র (বন্দে মাতরম)  অনেকেই মনে করেন শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত আসলে বাংলাতেই লেখা হয়েছিল।  শ্রিলংকরা জাতীয় সংগীতের রচয়িতা ছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।  এই ভাষাতেই রচিত হয়েছে কত কালজয়ী সাহিত্য , যা পৃথিবীর নানা ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।  ধর্মের নামে বাংলার ভূখন্ড ভাগের যন্ত্রনা আমাদের পিছু কখনোই ছাড়বে না কিন্তু বাংলা ভাষাটাও যেন আবার ধর্মের নামে দু ভাগ না হয়ে যায় !

এপার বাংলায় বসে যখন বাংলা ভাষার ক্ষরণ দেখি, তখন যতটা দুঃখ বা ভয় হয়, বাংলাদেশে যখন সে দেশের জাতীয় ভাষা স্বকীয়তা হারাতে থাকে তখন চিন্তাটা বোধ হয় সামান্য হলেও বেশি হয়। বাংলা ভাষা টা শেষমেশ বাংলাই থাকবে তো! ভাষা শহীদদের কথা ভেবেই হয় তো!

প্রতীক তরফদার । ০১-০৯-২০১৭ 

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।  


Tuesday, January 10, 2017

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৮


"প্রতীক, হোটেলে পৌঁছে আমায় একটা ফোন দিও"

- আমার উদ্দেশ্যে এই বাক্যটি ছুড়ে দিয়ে দিনের শেষে, বিদায় বেলায়, নিজের ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পরলেন আমার সহকর্মী। আমি তখনো হকচকিয়ে প্রায় শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। মাথার মধ্যে বেশ কয়েকটা ভাবনা একসাথে তাল পাকিয়ে যাচ্ছে। ওর ফোন কি খারাপ হয়ে গেছে! আমার থেকে ফোন চাইছে কেন! আমার কাছে তো কোনো অতিরিক্ত ফোন নেই - আমি আজ সবেমাত্র অন্য দেশে পৌঁছেছি ! কি তাহলে আমায় হোটেলে ছেড়ে আস্তে যাচ্ছে - না হলে হোটেলে পৌঁছে ফোন দেবার কথা বলছে কেন! সহকর্মীর ব্যাগ গোছানো শেষ। সে মাথা তুলে দ্যাখে, আমি তখনও তাকিয়ে রয়েছি তার দিকে - আমার মগজের একঝাঁক প্রশ্ন বোধহয় আমার মুখের অভিব্যাক্তিতেও টের পাওয়া যাচ্ছে। কি বলবো বুঝতে পারছি না! আর কেন আমার থেকে ফোন চাইছে তা তো অবশ্যই বুঝতে পারছি নাআমায় কিছুটা অপ্রস্তুত দেখে সেইই জিজ্ঞাসা করলো, আমি কিছু বলতে চাই কি না।  আমি সসংকোচে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম যে কেন সে আমার কাছে ফোন চাইছে। আমার প্রশ্ন শুনে সে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, সে আবার কখন ফোন চাইলো! আমি তাকে স্মরণ করালাম - এই যে বললে হোটেলে পৌঁছে ফোন দিও। সে দেখি অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো - বেশ একটা ROFL গোছের হাসি আর বললো 'প্লিজ রিং মি আফটার রিচিং ইওর হোটেল' সেই বুঝলাম, সারা জীবনের মতো যে, আমরা ফোন করি আর বাংলাদেশে ফোন বা কল  দেওয়া হয়।  আমিও আজকাল বাংলাদেশে গেলে অনায়াসে বন্ধু-বান্ধবদের থেকে ফোন চাই মানে কল বা  ফোন দিতে বলি আর কি।  

দুই পাড়েই আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি বটে কিন্তু শুধু উচ্চারণগত পার্থক্যই নয় - ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পার্থক্য নজরে আসে বাংলাদেশ গেলে।  কখনো কখনো এই ভাষার অমিলে বেশ মজা লাগলেও, অনেক সময়ে অসুবিধারও সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে একই অনুভূতি নিশ্চই আমাদের ওপারের বন্ধুদেরও  হয়।   এমনও  হয়েছে আমি কিছু প্রশ্ন শুনে কি উত্তর দেব বুঝে উঠতে পারিনি। বাড়িয়ে বলছি না এক ফোঁটাও। ধরুন হঠাৎ কোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের কথোপকথন অবশ্যই শুরু হয় - কি কেমন আছেন - আছো বা আছিস দিয়ে। আগে বাংলাদেশ গেলে যখন আমায় প্রথম সাক্ষাতে জিজ্ঞেস করা হতো 'কি অবস্থা?'  আমি বেশ চিন্তায় পরে যেতাম যে প্রশ্নকর্তা কোন 'অবস্থার' কথা জানতে চাইছেন - দেশের-দশের নাকি ব্যবসা-বাণিজ্যের। পরে বুঝলাম বাংলাদেশে 'কি অবস্থা' হল বিলিতি 'হেই হোয়াটস আপ' গোছের সাধারণ প্রশ্ন উত্তরটা সাদামাটা 'এই তো ভাইয়া' বা 'এইতো ভাই' গোছের হলেই হবে।

চলুন এবার বাংলাদেশে দৈনন্দিন কথোপকথনে ব্যবহৃত কিছু ভিন্ন শব্দ প্রয়োগের একটা ছোট্ট তালিকা বানানো যাক। প্রথমে আমি লিখবো এপার বাংলায় কি শব্দ ব্যবহার হয় আর তারপর লিখবো বাংলাদেশে ব্যবহৃত শব্দ। 

বাড়ি = বাসা
নুন = লবন
লঙ্কা = মরিচ
স্নান = গোসল
বাচ্চা = বাবু
পুচকে = পিচ্চি
জল = পানি
লিকার চা = লাল/রং চা
মাংস= গোশত

আরো অনেক আছে। এই মুহূর্তে এই কটাই মনে পড়লো। যারা পড়ছেন তারাও এই তালিকা'টি লম্বা বানাতে সাহায্য করতে পারেন।  

এবার আরেকটা মজার ঘটনা শোনাই আপনাদের । আমার প্রথম সস্ত্রীক ঢাকা ভ্রমণের সময়  আমার বন্ধু আর তার স্ত্রী আমাদের নিয়ে দুপুর বেলা খেতে বেড়িয়েছেন। রেস্তোরা থেকে ভরপেট কাচ্চি বিরিয়ানি-বোরহানী (বোরহানী টক দই দিয়ে তৈরী, হজমে সাহায্যকারী পানীয় বিশেষ) খেয়ে বেরোনোর পর হঠাৎ আমার বন্ধু-পত্নীর ইচ্ছে হলো তিনি আমাদের ঢাকার 'লাচ্ছি' খাওয়াবেন। খাদ্যরসিক আমি জীবনে বহু কিছু খেয়েছি কিন্তু এই নামের কোনো খাদ্য খাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার - আমার গিন্নিও ইশারায় বোঝালেন যে সেও খায়নি কোনো দিন এই লাচ্ছি নামের কোনো খাবার। উনি যতই লাচ্ছি খাওয়াবার  আগ্রহ দেখান, আমরা ততই মৃদু ভাবে এড়াবার চেষ্টা করি কারণ লাচ্ছা পরোটার কোনো তুতো ভাই বোন গোছের খাবার জন্য সত্যি কোনো জায়গা বেঁচে নেই পেটে।ভর্তি পেটের প্রতিবাদ'কে উনি কোনো মতেই পাত্তা না দিয়ে বললেন 'এক গ্লাস লাচ্ছি খেলে কোনো অসুবিধে হবে না দাদা'।  সেই বুঝলাম যে না এ কোনো খাদ্য নয়, এটি হলো পানীয়। অবশেষে রাজি হলাম।  চার জনের জন্যে চার গ্লাস 'লাচ্ছি' বানাতে বলা হলো।  নতুন কোনো পানীয় পান করার আশায় বেশ খুশি মনে অপেক্ষা করছি। দেখি আমাদের পানীয় পরিবেশক চারটি গ্লাসে অতি পরিচিত এবং ছোট বেলা থেকে অগুনতি বার পান করা 'লস্যি' এনে হাজির করলেন। এক বারের জন্যেও আমাদের খেয়াল হয়নি যে উচ্চারণগত পার্থক্যের জন্য আমাদের চেনা খাদ্য-পানীয় এতটা অচেনা লাগতে পারে!

আমাদের যেমন কলকাতা থেকে কলকাতার বাইরে বেরোলে ভাষার চলন-বলন সব কিছুই বদলাতে থাকে, বাংলাদেশেও তার কোনো ব্যতিক্রম নেই। উত্তর কলকাতা বা দক্ষিণ কলকাতার বাংলার মধ্যে হয়তো ততটা পার্থক্য নজরে আসবে না যতটা পার্থক্য নজরে আসবে পুরান ঢাকা বা ঢাকার নতুন তৈরী হওয়া অংশের বাংলার প্রয়োগে। আর ঢাকার বাইরের বেশ কিছু অংশের ভাষা এতটাই আলাদা যে সেগুলোর এক বর্ণ আমি কেন ঢাকার অনেক মানুষও বুঝতে পারেন না। হ্যা ঠিকই পড়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষার কথা বলা যেতে পারে। এক বার ট্রেইন' চেপে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছি। আমার পেছনের সিটে বসা দুই ভদ্রলোক নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন - আমার মনে হলো পৃথিবী বিখ্যাত মোবাইল পরিষেবা সংস্থা ভোডাফোনের বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় চরিত্র জুজু (ZOOZOO) রা নিজেদের মধ্যে ওদের বিখ্যাত অবোধ্য ভাষায় আড্ডা মারছেন।  একটা বর্ণ বুঝিনি আমি - হ্যা বুঝতে পেরেছিলাম কিছু ইংরেজি শব্দ আর মাত্র একটা বাংলা শব্দ - ঢাকা। 

বাংলাদেশে যখন বাংলা খবরের কাগজ পড়ি, সেখানেও খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটু অন্য ধাঁচের ভাষার বাঁধন নজরে আসে। এই মুহূর্তে একটা ব্যবহার খুব মনে পড়ছে - 'ঘোষণা দিয়েছেন'। এপারে ঘোষণা করা হয় আর ওপারে দেওয়া হয়। ছোট্ট উদাহরণ - '' পার্টির কার্য্য নির্বাহী সম্পাদক '' আগামী কাল থেকে অনির্দিষ্টকালের হরতালের ঘোষণা দিয়েছেন। এই বিষয়েও বাংলার দু পারে আশ্চর্য্য মিল খুঁজে পাই - পারে সর্বাত্মক বন্ধের ডাক পাড়ের সর্বাত্মক হরতালের ঘোষণায় কেমন নিখুঁত ভাবে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। প্রতিবাদের যেন ওই একটি ভাষাই জানা আছে বাঙালিদেরকি এপারে, কি ওপারে! আশার কথা - দুপাড়েই মানুষ এই জনজীবন স্তব্ধ করে দেওয়ার রাজনীতিতে চরম বিরক্ত এবং এপারের মতো ওপারেও আজকাল তত সারা মেলে না এই উন্নয়ন-বিরোধী কার্যক্রমে। 

বাংলাদেশে বারবার যাবার সুযোগ পেয়ে আমি আমার প্রিয় মাতৃ ভাষাকে আরো নতুন নতুন আঙ্গিকে জানার ও বোঝার সুযোগ পেয়ে যাই অনায়াসেই। আমায় কোনো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়তে হয়না - শুধু মনের জানালা গুলোকে খুলে রাখলেই যথেষ্ট। কত নতুন কিছুই যে অবলিলায় শিখতে পারি, বলে শেষ করা যাবে না। এই ভাষাগত নানান অনুভূতি নিয়ে নয় আরো একটা বা একের বেশি কিস্তি লেখা যাবে ভবিষ্যতে। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১০.০১.২০১৭

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।