পাখির নজরে দুনিয়া দেখার মজাই আলাদা। সেই সুযোগ কি আর বার বার পাওয়া যায়। কিন্তু যখন পাই, আমি ভুলেও সেই সুযোগ ছাড়ি না। বিমান যাত্রায়, আমার বরাবরের পছন্দের বসবার জায়গা তাই ইমার্জেন্সি এক্সিট'এর উইন্ডো সিট। পা ছড়িয়ে বসে পাখির নজরে বিশ্ব দেখি। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ঠিক আধ ঘন্টা সময়। এই আধ ঘন্টার যাত্রার জন্য আগে পরের এতো সময় ব্যয়, বেশ বিরক্তিকর। অবশ্য পথে যত কষ্টই হোক না কেন, নিজের বাড়িতে যাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আমার কাছেও বাংলাদেশ যেন তাই আমার এক বাড়ি ছেড়ে, অন্য বাসায় যাওয়া। আক্ষরিক অর্থেই। আমাদের বাড়ি ও দেশে হয়ে যায় বাসা। এরকম আরো অনেক ভাষার মিল অমিলের গল্প শোনাবো পরে, অবশ্যই আপনাদের শোনার ধৈর্য থাকলে।
কোমরে সিটবেল্ট বেঁধে, সবাই যখন অবতরণের জন্যে প্রস্তুত, আকাশ থেকেই টের পাওয়া যায়, ঢাকা শহরে অনেক মানুষের বসবাস। অনেক আনন্দ ও উত্তেজনার ডালি সাজিয়ে সে অপেক্ষা করছে তার কাছের মানুষ আর দূরের মানুষদেরকে একসাথে বুকে টেনে তার আদরে আপন করে নিতে। আকাশ থেকে শহর দেখতে আর সেই শহরের চরিত্র নির্ধারণ করতে আমার দারুন লাগে। আর ভালো লাগে ওপর থেকে সেই শহরের মেজাজ বুঝতে। সেও কি সম্ভব? বিশ্বাস হচ্ছেনা? দূর্গা পুজোর সময় কলকাতা আসুন কোনো সন্ধ্যা বা রাতের উড়ানে, শহর জুড়ে আলোর মালা আগাম জানান দেবে, এখন উৎসব - এ পারে। ঈদ এর সময় ঢাকা গেলে, ফাঁকা রাস্তা দেখে, আকাশ থেকেই টের পাবেন, উৎসবের আনন্দ আর শুধু ঢাকা'তেই সীমাবদ্ধ নেই, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে ঢাকার যানজট খুবই কুখ্যাত - আধ ঘন্টার রাস্তা পার হতে অনেক সময় লেগে যায় আড়াই/তিন ঘন্টা, অনায়াসে। কিন্তু বছরে দু বার ঈদের সময় অনেকেই যখন উৎসবের উদযাপনে শহরের বাইরে চলে যান, জানজটহীন সেই রাজধানীর সে এক অন্য রূপ। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা'কেও টেক্কা দিতে পারে ঢাকা সেই সময়।
ঢাকা'র হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে, ২০১০ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। হজরত শাহজালাল ছিলেন এক বিখ্যাত সুফী পন্ডিত। ওঁনার জন্ম বর্তমানের তুরস্ক অর্থাৎ টার্কি'তে। মক্কা'তে উনি ওনার পাঠ শেষ করে ভারতে আসেন ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে। ভারতের নানান প্রান্তে ভ্রমণ করে উনি স্থায়ী হন শ্রীহট্টে অর্থাৎ সিলেটে যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ।
ঢাকা বিমানবন্দরের একটা বড় বৈশিষ্ট হলো - এর ব্যবহারকারীদের বৈচিত্র। সমাজের এতো শ্রেণীর মানুষকে একই ছাদের তলায় এক সাথে খুব কম'ই দেখতে পাওয়া যায়। উঁচু তলা থেকে একদম নিচু তলার মানুষ - সবাই কে পাওয়া যায় এই বিমানবন্দরে। অবাক হচ্ছেন? কারণ টা বলি। অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে অসংখ্য NGO’তে ভরা বাংলাদেশে বোধ হয় হতো দরিদ্র মানুষেরা থিক থিক করছে। এক বার গিয়ে দেখে আসুন - চোখ কপালে উঠলে, উঠতেও পারে। যাদের কাছে অর্থ আছে, সে যে কি পরিমানে আছে সেটা শুধু তাঁদের লাইফ স্টাইল দেখলেই টের পাওয়া যায়। মধ্যবিত্তের সংখ্যা সে অনুপাতে কম। এঁদেরকে অবশ্যই দেখতে পাওয়া যাবে বিমানবন্দরে। কেউ ব্যবসা বা অফিসের কাজে, কেউ বেড়াতে যাবার জন্যে বা কেউ চিকিৎসা করতে শহরের বা দেশের বাইরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ শুধু দেশের বাইরে যাচ্ছেন বাজার করতে। এবার বলি তাঁদের কথা, NGO'র পরিষেবা যাঁদের কাছে পৌঁছনোর কথা থাকলেও, পৌঁছয় না। সুলভ বললেও বেশি বলা হবে, অত্যন্ত সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার মস্ত বাজার হলো বাংলাদেশ। রুপোলি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে বেঁধে হাজারে হাজারে শ্রমিক দেশের বাইরে উড়ে যান প্রতি বছর - অনেকেই মধ্য প্রাচ্যে (মিডল ইস্ট) কেউ বা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে। ওঁদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আমার কেন জানিনা, খুব কষ্ট হয়। অজানা আশংকায় মন ভারী হয়ে ওঠে। ওঁদের দালাল, গন্তব্যে পোঁছলেই, পাসপোর্ট নিয়ে রেখে দেবে নিজের কাছে। প্রিয় জনদের মুখে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত তুলে দিতে আর অদেখা ভবিষ্যতের মায়াজাল বুনতে বুনতে ওঁরা প্রাণপাত করবেন। কখনো ন্যায্য মূল্যের কাছাকাছি মজুরি পাবেন, কখনো তাও পাবেন না। তবু আশায় বাঁচে চাষা। (ক্রমশ)
প্রতীক তরফদার । ১৫.০৯.২০১৬

No comments:
Post a Comment