Tuesday, October 18, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৫


প্রাচ্যের ভেনিস, পৃথিবীর রিকশা-রাজধানী, মসজিদের শহর ঢাকা কিন্তু বয়সে, অভিজ্ঞতায় আমাদের প্রিয় কলকাতার বড়দা। বড় অবশ্য সে বহরেও, জনসংখ্যায় আর জনঘনত্বে। কলকাতায় যেমন দেখতে পাওয়া যায় ব্রিটিশদের জোরদার প্রভাব, তেমন ঢাকায় রয়েছে মুঘলদের বেশ কিছু ছোঁয়া। বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের মতো শহরের বাইরে নয় বরং কলকাতার মতো শহরের গায়েই ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই মূল রাস্তা দিয়ে ডান দিকে এগোলেই পাওয়া যাবে ঢাকা'কে আর বাঁ দিকে গেলেই উত্তরা - আমাদের সল্টলেক'এর মতো পরিকল্পিত ও সম্প্রসারিত শহর।

নতুন নতুন জায়গায় যেতে আমার যেমন ভালো লাগে, তেমনি ভালো লাগে সে সব জায়গার ইতিহাস ভালো করে জানতে, বুঝতে। এ যেন কিছুটা আন্তরিক প্রেমের মতোই। প্রেয়সীর মেজাজ বুঝতে হলে, শুরু থেকে তার যাত্রার চড়াই-উৎরাই অংশ গুলোও জেনে নিতে হবে। আমার বোধ-বুদ্ধির বয়স যত বাড়ছে, ইতিহাসের প্রতি আগ্রহও তত বাড়ছে। আগে কেউ জাদুঘরে (মিউসিয়াম) যাবার প্রস্তাব দিলে মনে, মনে বেশ হতাশ হতাম, আর এখন নিজেই আগে থেকে জাদুঘর খুঁজি।
কলকাতা শহরের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় মোটামুটি সপ্তদশ শতকের (17th সেঞ্চুরি) শেষের দিক থেকে। জব চার্ণক কলিকাতা গ্রামে আসার পর। যদিও এই অঞ্চলে জনবসতির প্রমান পাওয়া গেছে নাকি প্রায় দুই হাজার বছর আগে থেকেই। সেদিক থেকে ঢাকার ইতিহাসের আভাস পাওয়া যায় কিন্তু আরো অনেক আগে। প্রথম শতক (1st সেঞ্চুরি) থেকেই এই অঞ্চলে শহুরে বসতি ছিল বলে জানা যায়। ঢাকা ছিল পুরোনো বিক্রমপুর জেলার অংশ যা কিনা ছিল আবার সেন সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। এর পরে ঢাকা চলে যায় মুঘল দের দখলে, ষোড়শ শতকের শেষের দিকে। তারা এই শহরকে বাংলার রাজধানী হিসাবে বেছে নেন ১৬০৮ সালে। কিছুদিনের জন্যে অবশ্য ঢাকার নাম হয়ে যায় জাহাঙ্গীরনগর। রাজধানীর প্রথম প্রশাসক, ইসলাম খান চিস্তী সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে এই নাম কারণ করেন এবং ওনার মৃত্যুর সাথে সাথে এই নামেরও মৃত্যু হয় - শহর ফিরে পায় তার পুরোনো নাম - ঢাকা।

মুঘল জমানায়, শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে ঘটে ঢাকার মূল সম্প্রসারণ। সমৃদ্ধি আর আভিজাত্যের সে ছিল এক অনন্য অধ্যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে তখন মুঘল বাংলার ঈর্ষণীয় কর্তৃত্ব। গোটা সাম্রাজ্যের জিডিপি'র ৫০% ই তখন বাংলার অবদান, যা ছিল একাধারে সারা পৃথিবীর জিডিপি'র ২৫% । সারা পৃথিবীর ব্যবসায়ীদের তখন ঢাকার দিকে নজর আর তাকে কেন্দ্র করে মস্ত কর্মযজ্ঞ। হবে নাই বা কেন ঢাকা তখন মসলিন কাপড় ব্যবসার প্রাণ ভ্রমর। সেই সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতকেও প্রায় আসি হাজার দক্ষ তাঁতি যুক্ত ছিলেন এই শিল্পের সাথে! সারা শহর জুড়ে ছিল বহু বাগান, বাজার, মসজিদ, মন্দির আর স্মৃতিস্তম্ভ!

অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে আবার এই শহরের হাত বদলের পালা এবং এইবার সেটা ব্রিটিশদের কাছে। যারা সুপরিকল্পিত ভাবে ঢাকার থেকে যত টুকু শুষে নেবার শুষে নিয়ে, তাকে ঠেলে দেয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। ব্রিটিশ শাসিত অখণ্ড ভারতে তখন কলকাতার উত্থানের পালা। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১৮.১০.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।

এক বাঙালের বাংলাদেশ – ৪ (4)


বাংলাদেশ ছারা আর মাত্র তিনটি দেশের অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমি । ভারতকে ধরলে অবশ্য সংখ্যাটা দাঁড়াবে চার । তুলনামূলক ভাবে অনেক তাড়াতাড়ি কাজ মিটেছে সেসব দেশে। বিনীত পরামর্শ, হাতে সময় ও সঙ্গে অনেক ধৈর্য নিয়ে ইমিগ্রেশন'এর লাইনে দাঁড়াবেন ঢাকায়। কপাল ভালো না থাকলে, ১ থেকে দেড় ঘন্টা অনায়াসে লাগতে পারে। বেশির ভাগ ইমিগ্রেশন অফিসার'রাই বন্ধু সুলভ। সাধারণত ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট দেখলে ইংলিশ বা একটু নড়বড়ে হিন্দি'তে কথা বলা শুরু করেন আর বাংলাভাষী বুঝলে, প্রাণ খুলে কুশল বিনিময় করেন। এখনো সেই অফিসার'কে ভুলতে পারি না, যিনি আমরা বাংলাদেশে মধুচন্দ্রিমায় গেছি শুনে খুব বিস্মিত আর অসম্ভব আনন্দিত হয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন এই প্রথম কোনো ভিন দেশি দম্পতিকে দেখলেন বাংলাদেশে মধুচন্দ্রিমায় আসতে, বহু দেশি দম্পতিকে দেশের বাইরে যেতে দেখেছেন শুধু। বলেছিলেন, আবার আসবেন। না উনি জানতেন, না আমি জানতাম যে সিঙ্গল এন্ট্রি ভিসা নিয়ে আর কুলোতে পারবো না, মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা নিয়ে বার বার ছুটে যাবো বাংলা থেকে বাংলাদেশে।

যারা প্রথম বাংলাদেশে যাবেন, তাদের জন্য কিছু তথ্য এই সুযোগে জানিয়ে রাখি -
১. আপনার চেক ইন ব্যাগেজ এ Fragile ট্যাগ লাগাতে ভুলবেন না। ঢাকা বিমানবন্দরের ব্যাগেজ হ্যান্ডলার'রা অধিকাংশ সময়ই তাড়ায় থাকেন। ওনাদের কল্যানে আমার ব্যবহৃত সব Suitcase বা ব্যাগ গুলোরই করুন দশা - দেখলেই মনে হয় বহু লাঞ্ছিতা, নির্যাতিতা। Fragile ট্যাগ লাগানো সত্ত্বেও।
২. USD এক্সচেঞ্জ করে বাংলাদেশী টাকা পেতে হলে, বিমানবন্দর থেকে যতটা না করলেই নয়, ততটাই করুন । বাইরে তুলনামূলক ভাবে বেশি দর পাবেন।
৩. বিমানবন্দরের ভেতর থেকেই মোবাইল সিম কিনতে পারেন। ভয়েস কল ও ডেটার জন্য গ্রামীণফোন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসাবে অত্যন্ত নির্ভর যোগ্য। 3G ইন্টারনেট স্পিড খুবই ভালো। না, এই লাইন’টা লেখার জন্যে আমার গ্রামীনফোনের সাথে কোনো গোপন চুক্তি হয় নি।
৪. সুরায় আসক্তি থাকলে, ইমিগ্রেশন কাউন্টার-এ পৌঁছনোর আগেই ডিউটি ফ্রি শপ এ গিয়ে আপনার কোটার বিশেষ পানীয় সংগ্রহ করে নিতে পারেন। না হলে, শহরে চেনা বন্ধু না থাকলে, চড়া দামে আপনার তেষ্টা মেটাতে হবে, কোনো পাঁচ তারা হোটেল'এর Bar'এ বসে। ধর্মীয় বিধি নিষেধের কারণে সুরা (ওয়াইন) বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।
৫. আপনার বাঙাল ভাষার দক্ষতা পরখের প্রাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য ল্যাবরেটরি হিসাবে দয়া করে বাংলাদেশ কে বেছে নেবেন না। আপনার অজান্তেই আপনি কিন্তু হাসির খোরাকে পরিণত হবেন। CNG বা ট্যাক্সি ড্রাইভার'এর সাথে দরদাম করার সময় নিজের বিদেশী পরিচয় গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে স্থানীয় ভাবাতে গেলে ঠকে যাবেন। এরকম বহু বিচিত্র চেষ্টা আমি এপারের বাঙালিদের ওপারে গিয়ে করতে দেখেছি আর মনে, মনে খুব হেসেছি। 'হামি তুমাকে ভালোবাসসি', 'হামি মিষ্টি দই খাবে' বললেই যেমন কলকাতার বাঙালি হওয়া যায় না, ঠিক তেমনি বেসুরে ধ্রুপদী সংগীত গাওয়ার মতো সুর করে বাংলা বললেই সেটা ঢাকার স্থানীয় বাচনভঙ্গি বা অ্যাকসেন্ট হয়ে যায় না। গাড়ির চালক আপনার বিচিত্র চেষ্টা দেখে, দ্বিগুনের জায়গায় তিন গুন্ ভাড়া চেয়ে বসতে পারে । এই সুযোগে বলে রাখি, বাংলাদেশে তিন চাকার মোটর চালিত যান কে কেউ অটোরিকশা বলেন না। CNG চালিত রিক্সা ওখানে পরিচিত CNG নামেই।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই চোখে পরবেই পরবে এক অনিন্দ্য সুন্দর, মানুষের তৈরী kaleidoscope। দামি সুগন্ধি মেখে, হাল ফ্যাশনের জামা কাপড় পরে, লম্বা লম্বা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষারত কিছু বিত্তবান মানুষের সাথে অসংখ্য সাধারণ মানুষের ভিড়। গত সপ্তাহের হাটে বা মেলা থেকে কেনা নতুন হাফ প্যান্ট আর শার্ট পরে, ফুল ছাপ সালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় রঙ্গীন ওড়না দিয়ে কত ছোট ছোট বাচ্চারা অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয় আব্বাজানের জন্যে বা আম্মার জন্যে। তাদের সঙ্গে তাদের আব্বু বা আম্মু অমোঘ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ওদের কাছের মানুষ গুলোকে সামনে থেকে দেখবেন বলে - কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর। এই আসার অপেক্ষার উত্তেজনাই আলাদা। আসা যাওয়ার মাঝে, ডিপার্চার এর থেকে এরাইভাল আমার অনেক বেশি প্রিয়। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ২৯.০৯.২০১৬

*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।