গত কয়েক মাসে বেশ
অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন বা মৃদু
অভিযোগ এসেছে যে ‘এক বাঙালের
বাংলাদেশ'এর কি হল!!! দায়ি করব আমার ব্যস্ততা আর কিছুটা কুঁড়েমিকেই । আমি অবাক হয়েছি
যে আমার এই ব্লগ এতো মানুষ
মন দিয়ে পড়েছেন আর ভালবেসেছেন! সত্যি বলতে
কি যত না বেশি
অবাক হয়েছি, আনন্দিত হয়েছি তার চেয়ে অনেক
বেশি। তাই আবার যাত্রা
শুরু, দেখি কত দিন
টানা যায়। একটা ধারাবাহিকতা
রক্ষা করার চেষ্টা করবো।
শেষ কিস্তির খেই ধরেই লেখা
শুরু করলাম।
সতের কোটি বাংলাভাষী
মানুষের দেশ, বাংলাদেশ। এদেশের
জন্মের পেছনে কিন্তু একটা অন্যতম কারণ
ছিল ভাষা। বাংলা ভাষা। আর সেই বাংলাদেশের অধিকাংশ
মানুষের সঙ্গে যখন আমার প্রথম
আলাপ হয়,
কেন জানিনা আমার
কানে একটা অদ্ভুত অনুভূতি
হয়। আমার চার পাশে
এতো বাংলাভাষী
মানুষ কিন্তু তাদের প্রথম পরিচয় অর্থাৎ তাদের নাম - তাতে
আর যাই থাক বাংলার
ছোয়া খুঁজে পাই না! আমরা
যারা কলকাতার আসে পাশে বড়
হয়েছি, তারা মূলত বাংলা
নাম শুনেই অভ্যস্ত - প্রশান্ত, প্রফুল্ল, অঞ্জন, কৌশিক, তিলোত্তমা, চন্দ্রিমা, কত যে বৈচিত্র
- সবই বাংলা শব্দ। বাংলাদেশের নাম গুলো কিন্তু
বেশির ভাগই হয় আরবি,
ফার্সি নয় উর্দু । সুন্দর,
সুন্দর সব শব্দ
যার অধিকাংশরই মানে আমার জানা
নেই। নাম
গুলোর সঙ্গে তাই একাত্ম হতে
একটু সময় লাগে আমার।
হতে পারে আমার হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে
বড় হওয়ার প্রভাব।বাংলাভাষী সনাতন
ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অ -বাংলা নাম
রাখার প্রবণতা প্রায় নেই বললেই চলে
- সে এ পারে হোক
কি ও পারে। এই
আমিই যদি মালদহ
বা মুর্শিদাবাদে অনেক মুসলমান ধর্মাবলম্বি মানুষের মধ্যে
থেকে বড় হতাম, সে
ক্ষেত্রে হয়তো বিষয় টা
অন্য রকমের হতো।
বাংলাদেশী
সংখ্যাগুরু মানুষদের নামে মূলত থাকে দুটি বা
তিনটি অংশ। দুটো অংশের
নামের একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক – ‘ইরফান হক’। এই
নামের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে
একটা অ-বাংলা শব্দ
বা কোন বাংলা
শব্দ। ধরে
নেওয়া যাক ‘ইরফান হক
ইসলাম’ বা ‘ইরফান হক
প্রান্ত। অধিকাংশ
মানুষই অ-বাংলা নামেই
বেশি পরিচিত - ধরা যাক 'সেলিম
ভায়া (ভাইয়া)' আবার কেউ কেউ তাঁদের নামের বাংলা অংশটা ব্যবহার করতে ভালবাসেন। ্কারো নাম স্বপন বা বৈশাখী শুনে আপনি যেই
ভাবছেন 'নমস্কার' বলে অভিবাদন করবেন, উনি আপনাকে ্সম্পুর্ন অবাক
করে দিয়ে বলতে পারেন
'আদাব'। বাংলাদেশের এই
অভিবাদন জানাবার অভ্যাসটা আমাকে খুব আকর্ষণ করে।
ও দেশে এটা খুব
নিয়মিত। এমন নয় যে
কেবল বিশেষ মানুষ হলেই তিনি অভিবাদিত
হবেন বা সেলাম পাবেন।
সে দেশে দেখা হলেই হয়
'আসসালাম ওয়ালাইকুম' বা 'নমস্কার' বিনিময়
হবেই। সালামের শব্দ পরিবর্তন হয়
মানুষের ধর্ম হিসেব করে।
‘আসসালাম ওয়ালাইকুম' বা ‘নমস্কার সাধারণত
মুসলমান বা হিন্দুদের নিজ
নিজ ধর্মাবলম্বি মানুষদের মধ্যে বেশি
ব্যবহার হয় - আর সেটাই
যখন দুই সম্প্রদায়ের মানুষের
মধ্যে হয়, শব্দটা বদলে
গিয়ে হয়, ‘আদাব’। এরকম
ভাবার কোন কারণ নেই
যে এর ব্যতিক্রম নেই। 'আসসালাম
ওয়ালাইকুম' শব্দবন্ধ'টা যদিও বাংলা নয় কিন্তু
এর অর্থটা আমার খুব প্রিয়
- 'আপনার উপর শান্তি বর্ষিত
হোক'।
শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে
কি বা আসে যায়।
আসে যায় বোধ হয়
- নাম দিয়েই তো বোঝা যায়
মানুষের 'ধর্ম'।না আমি ধর্ম
বলতে নিয়ম, নীতির কথা বলছি না।
এ ধর্ম মানুষের সেই
পরিচয় ,যা কিনা মানুষ
কে মান আর হুঁশের
আগেও হয়
হিন্দু , মুসলমান , শিখ বা
খ্রিষ্টান বানিয়েছে।
বাংলাদেশে গিয়ে আমার প্রথম
উপলব্ধি হয়েছিল যে ভাষারও বোধ হয় ধর্মান্তকরণ
করা যায়। আর সেই
কারণেই হিন্দুরা যে
পানীয়কে জল বলেন,
মুসলমানেরা তাকে বলেন পানি।
হিন্দু বড় ভাই দাদা হলেও মুসলমান বড়
ভাই হয়ে
যায় ভাইয়া। পশ্চিম্বঙ্গেও বাংলাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের
মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার এপারের মূল ধারার চেয়ে কিছুটা আলাদা।
আমার
ভাবতে কেমন অদ্ভুত
লাগে শুধু ধর্ম
ভেদে একই ভাষায় সম্পর্কের নাম
গুলো কেমন বদলে যায়
- কিছু উদাহরণ দিলাম নীচে -
বৌদি
- ভাবি
দিদি
- আপা
জামাইবাবু
- দুলাভাই
মাসি
- খালা
মেসো
- খালু
মাসতুতো
- খালাতো
পিসি
- ফুপু
পিসা
- ফুপা
পিস্ততো
- ফুপাতো
কাকা
- চাচা
কাকী
- চাচী
খুড়তুতো
- চাচাতো
ঠাকুমা
- দাদি
ঠাকুরদা
- দাদা
দিদা
- নানী
দাদু
- নানা
শুধু সম্পর্কই নয়, আরো অনেক শব্দই বোধ হয় ধর্মের হাত ধরে বা আঞ্চলিক প্রভাবে সে দেশে অন্য ভাবে পরিচিত। গত কিস্তিতে কিছু নমুনা দিয়েছিলাম আর এই কিস্তিতে জুড়েদিলাম আরো কিছু।
শুধু সম্পর্কই নয়, আরো অনেক শব্দই বোধ হয় ধর্মের হাত ধরে বা আঞ্চলিক প্রভাবে সে দেশে অন্য ভাবে পরিচিত। গত কিস্তিতে কিছু নমুনা দিয়েছিলাম আর এই কিস্তিতে জুড়েদিলাম আরো কিছু।
জলখাবার তো বেশ সুন্দর বাংলা। বাংলাদেশে কিন্তু ওটা নাস্তা।আর বাংলাদেশে কিন্তু আপনাকে নিমন্ত্রণ করা হবে না। দেওয়া হবে দাওয়াত ।সে দেশে মৃত্যু হয় না, হয় ইন্তেকাল। সে দেশে উনুন জ্বলে না, ওখানে জ্বলে চুলা।এই তালিকা কিন্তু বেশ লম্বা। অত সহজে শেষ হবার নয়।শুধু বাচনভঙ্গির বৈচিত্রেই নয়, শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বাংলা স্বতন্ত্র।
আমার কিছু বন্ধুরা হয়তো বা আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাই তো এগিয়ে চলেছে নিয়মিত ভাঙা আর গড়ার মধ্যে দিয়েই।বিদেশী প্রচুর শব্দই আমাদের ভাষাকে অতীতে সমৃদ্ধ করেছে আর বর্তমানেও করে চলেছে।কিন্তু কেন জানি না তাও আমার এই এপার বাংলার কান আজও অনেক সময় বাংলাদেশের বাংলা কে বুঝতে সময় নিয়ে ফেলে !
ভাবতেও
ভালো লাগে যে আমার
মাতৃ ভাষায় কথা বলা মানুষের
সংখ্যা তিরিশ কোটিরও বেশি। সামগ্রিক
ভাষা ব্যবহারের দিক দিয়ে পৃথিবীতে
বাংলার স্থান সপ্তমে। এই
ভাষাতেই রচিত হয়েছে দুটি
দেশে জাতীয় সংগীত (জন গণ মন
অধিনায়ক এবং আমার সোনার
বাংলা ) ও একটি দেশের
জাতীয় স্তোত্র (বন্দে মাতরম)। অনেকেই
মনে করেন শ্রীলংকার জাতীয়
সংগীত’ও আসলে বাংলাতেই
লেখা হয়েছিল। শ্রিলংকরা
জাতীয় সংগীতের রচয়িতা ছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই
ভাষাতেই রচিত হয়েছে কত
কালজয়ী সাহিত্য , যা পৃথিবীর নানা
ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। ধর্মের নামে বাংলার ভূখন্ড
ভাগের যন্ত্রনা আমাদের পিছু কখনোই ছাড়বে
না কিন্তু বাংলা ভাষাটাও যেন আবার ধর্মের
নামে দু ভাগ না
হয়ে যায় !
এপার
বাংলায় বসে যখন বাংলা
ভাষার ক্ষরণ দেখি, তখন যতটা দুঃখ
বা ভয় হয়, বাংলাদেশে
যখন সে দেশের জাতীয়
ভাষা স্বকীয়তা হারাতে থাকে তখন চিন্তাটা
বোধ হয় সামান্য হলেও
বেশি হয়। বাংলা ভাষা
টা শেষমেশ বাংলাই থাকবে তো! ঐ ভাষা
শহীদদের কথা ভেবেই হয়
তো!
প্রতীক তরফদার । ০১-০৯-২০১৭
*** আমি লিখছি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের সাথে ভাগ করে নিতে। অনেকে পড়ে আনন্দ পাচ্ছেন, পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, এই লেখা তাদেরই জন্যে। সব মতামত আমার একান্ত ব্যক্তিগত, কারো ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কোনো তথ্যগত ভুল থাকলে, দয়া করে আমায় সংশোধন করে দেবেন। লিখে আনন্দ পাচ্ছি, তাই লিখছি - কোনো বিশেষ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেকে প্রমানের কোনো তাগিদ নেই।
