Thursday, September 22, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ৩



বাঙালি কে? বাংলা যার মাতৃ ভাষা তিনি, নাকি যিনি বাংলাদেশের নাগরিক! এই ধন্দ সম্বন্ধে প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমার বাংলাদেশে গিয়ে। আমি বাঙালি বলে পরিচয় দিলে, অনেকেই এখনো আমাকে সংশোধন করে দেন - 'দাদা ইন্ডিয়ান বলেন, ও বুঝছি আপনি কলকাতার মানুষ'। বাংলাদেশী আর বাঙালি সেখানে সমার্থক। আমাদের মতো মানুষরা তাই ইন্ডিয়ান, কলকাতার মানুষ। অনেক পশ্চিমবঙ্গীয় বা ঘটির কাছে অবশ্য শুধু ওনারাই বাঙালি আর সব বাংলাদেশীই হলেন বাঙাল। আমার কাছে বাঙালি বলতে যেহেতু যে কোনো বাংলা ভাষী মানুষ, তাই আমার লেখায় বাঙালি লেখা থাকলে, তাঁকে আলাদা করে বাংলাদেশী হিসাবে ভাববার প্রয়োজন নেই। লক্ষ্য করেছি ভারতীয় শব্দ'টা বাংলাদেশে সেরকম বেশি ব্যবহার হয় না। অবশ্য ভারতের বাঙালিও আজকাল মিশ্র ভাষায় বেশি কথা বলার কারণে ভারতীয় শব্দটা একটু কম'ই ব্যবহার করেন। অথচ এই বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষীদের নিয়ে এই উপমহাদেশে কত যে আন্দোলন হয়েছে আর কত যে রক্ত ঝরেছে তার খবর জেনারেশন X, Y, Z এর অনেকেই রাখেন না।

কাঁটা তারের এ পাশের বাঙালিরা যারা কোনো দিন বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পান নি অথচ ভাবেন তিনি বাঙলিদের মজ্জায় মজ্জায় চেনেন, তাদের কে বলবো আবার ভেবে দেখতে। আসলে আপনি দেখেছেন, বাঙালিদের তিন ভাগের এক ভাগের বেশি কিছু মানুষ কে। বাকি অংশ কিন্তু বাস করেন কাঁটা তারের ওপারে, অন্য একটা দেশে। আস্ত একটা দেশ যার জন্ম হওয়ার প্রেক্ষাপটের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভাষা - বাংলা ভাষা।

ছোট বেলায় ইতিহাসে বঙ্গ ভঙ্গ সম্বন্ধে পড়েছি - পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্যে। না ছিল কোনো বোঝার পরিপক্কতা, না ছিল অনুধাবন করার সেই গভীরতা যে কত বড় সর্বনাশের বীজ সেই দিন বোনা হয়েছিল বঙ্গ ভঙ্গের নামে। একটা জাতির মেরুদন্ড কে দু'টুকরো করে সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে রাখার চক্রান্ত ছিল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। যার মূল্য এখনো চুকিয়ে চলেছে বাঙালি।

আর কিছু দিন পরেই আনুষ্ঠানিক ভাবে সারা পৃথিবীতে পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত হবে বাংলা হিসাবে। আমাদের অনেক ছোট বোন-ভাইয়েরাই হয়তো জানেন না বাংলা নামে যে বিশাল অঞ্চল অবিভক্ত ভারতবর্ষে ছিল তার অংশ ছিল বর্তমানের বিহার, ওডিশা, আসাম এবং অবশ্যই পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশ। পাহাড় থেকে সমুদ্র আর তার সাথে প্রকৃতির উজাড় করা প্রাকৃতিক সম্পদ - সার্থক অর্থেই সোনার বাংলা।

মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কত সৌভাগ্যবান যে আমার কাজ আমাকে আমার শিকড় চেনার সুযোগ করে দিয়েছে। এ সুযোগ অনেকেই পান না। খুব মন দিয়ে খেয়াল করে দেখেছি যে এপার আর ওপর বাংলার মানুষের মধ্যে কোথাও একটা ভুল বোঝা বুঝির চোরা স্রোত আছে। যে স্রোতের অভিমুখ পরিবর্তন দরকার নিজেদের কে ভালো করে চেনার আর জানার দিকে। আমার এই লেখা যদি সেই উদ্দেশে একটুকুও অবদান রাখতে পারে, নিজেকে ধন্য মনে করবো। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ২২.০৯.২০১৬

Friday, September 16, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ২


পাখির নজরে দুনিয়া দেখার মজাই আলাদা। সেই সুযোগ কি আর বার বার পাওয়া যায়। কিন্তু যখন পাই, আমি ভুলেও সেই সুযোগ ছাড়ি না। বিমান যাত্রায়, আমার বরাবরের পছন্দের বসবার জায়গা তাই ইমার্জেন্সি এক্সিট'এর উইন্ডো সিট। পা ছড়িয়ে বসে পাখির নজরে বিশ্ব দেখি। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ঠিক আধ ঘন্টা সময়। এই আধ ঘন্টার যাত্রার জন্য আগে পরের এতো সময় ব্যয়, বেশ বিরক্তিকর। অবশ্য পথে যত কষ্টই হোক না কেন, নিজের বাড়িতে যাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আমার কাছেও বাংলাদেশ যেন তাই আমার এক বাড়ি ছেড়ে, অন্য বাসায় যাওয়া। আক্ষরিক অর্থেই। আমাদের বাড়ি ও দেশে হয়ে যায় বাসা। এরকম আরো অনেক ভাষার মিল অমিলের গল্প শোনাবো পরে, অবশ্যই আপনাদের শোনার ধৈর্য থাকলে।
কোমরে সিটবেল্ট বেঁধে, সবাই যখন অবতরণের জন্যে প্রস্তুত, আকাশ থেকেই টের পাওয়া যায়, ঢাকা শহরে অনেক মানুষের বসবাস। অনেক আনন্দ ও উত্তেজনার ডালি সাজিয়ে সে অপেক্ষা করছে তার কাছের মানুষ আর দূরের মানুষদেরকে একসাথে বুকে টেনে তার আদরে আপন করে নিতে। আকাশ থেকে শহর দেখতে আর সেই শহরের চরিত্র নির্ধারণ করতে আমার দারুন লাগে। আর ভালো লাগে ওপর থেকে সেই শহরের মেজাজ বুঝতে। সেও কি সম্ভব? বিশ্বাস হচ্ছেনা? দূর্গা পুজোর সময় কলকাতা আসুন কোনো সন্ধ্যা বা রাতের উড়ানে, শহর জুড়ে আলোর মালা আগাম জানান দেবে, এখন উৎসব - এ পারে। ঈদ এর সময় ঢাকা গেলে, ফাঁকা রাস্তা দেখে, আকাশ থেকেই টের পাবেন, উৎসবের আনন্দ আর শুধু ঢাকা'তেই সীমাবদ্ধ নেই, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরেছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে ঢাকার যানজট খুবই কুখ্যাত - আধ ঘন্টার রাস্তা পার হতে অনেক সময় লেগে যায় আড়াই/তিন ঘন্টা, অনায়াসে। কিন্তু বছরে দু বার ঈদের সময় অনেকেই যখন উৎসবের উদযাপনে শহরের বাইরে চলে যান, জানজটহীন সেই রাজধানীর সে এক অন্য রূপ। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা'কেও টেক্কা দিতে পারে ঢাকা সেই সময়।
ঢাকা'র হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে, ২০১০ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। হজরত শাহজালাল ছিলেন এক বিখ্যাত সুফী পন্ডিত। ওঁনার জন্ম বর্তমানের তুরস্ক অর্থাৎ টার্কি'তে। মক্কা'তে উনি ওনার পাঠ শেষ করে ভারতে আসেন ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে। ভারতের নানান প্রান্তে ভ্রমণ করে উনি স্থায়ী হন শ্রীহট্টে অর্থাৎ সিলেটে যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ।
ঢাকা বিমানবন্দরের একটা বড় বৈশিষ্ট হলো - এর ব্যবহারকারীদের বৈচিত্র। সমাজের এতো শ্রেণীর মানুষকে একই ছাদের তলায় এক সাথে খুব কম'ই দেখতে পাওয়া যায়। উঁচু তলা থেকে একদম নিচু তলার মানুষ - সবাই কে পাওয়া যায় এই বিমানবন্দরে। অবাক হচ্ছেন? কারণ টা বলি। অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে অসংখ্য NGO’তে ভরা বাংলাদেশে বোধ হয় হতো দরিদ্র মানুষেরা থিক থিক করছে। এক বার গিয়ে দেখে আসুন - চোখ কপালে উঠলে, উঠতেও পারে। যাদের কাছে অর্থ আছে, সে যে কি পরিমানে আছে সেটা শুধু তাঁদের লাইফ স্টাইল দেখলেই টের পাওয়া যায়। মধ্যবিত্তের সংখ্যা সে অনুপাতে কম। এঁদেরকে অবশ্যই দেখতে পাওয়া যাবে বিমানবন্দরে। কেউ ব্যবসা বা অফিসের কাজে, কেউ বেড়াতে যাবার জন্যে বা কেউ চিকিৎসা করতে শহরের বা দেশের বাইরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ শুধু দেশের বাইরে যাচ্ছেন বাজার করতে। এবার বলি তাঁদের কথা, NGO'র পরিষেবা যাঁদের কাছে পৌঁছনোর কথা থাকলেও, পৌঁছয় না। সুলভ বললেও বেশি বলা হবে, অত্যন্ত সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার মস্ত বাজার হলো বাংলাদেশ। রুপোলি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে বেঁধে হাজারে হাজারে শ্রমিক দেশের বাইরে উড়ে যান প্রতি বছর - অনেকেই মধ্য প্রাচ্যে (মিডল ইস্ট) কেউ বা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে। ওঁদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আমার কেন জানিনা, খুব কষ্ট হয়। অজানা আশংকায় মন ভারী হয়ে ওঠে। ওঁদের দালাল, গন্তব্যে পোঁছলেই, পাসপোর্ট নিয়ে রেখে দেবে নিজের কাছে। প্রিয় জনদের মুখে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত তুলে দিতে আর অদেখা ভবিষ্যতের মায়াজাল বুনতে বুনতে ওঁরা প্রাণপাত করবেন। কখনো ন্যায্য মূল্যের কাছাকাছি মজুরি পাবেন, কখনো তাও পাবেন না। তবু আশায় বাঁচে চাষা। (ক্রমশ)
প্রতীক তরফদার । ১৫.০৯.২০১৬

Wednesday, September 14, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ১



আজকাল কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসলে, কথোপকথনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে বাংলাদেশ। কর্মসূত্রে আমার ঘন ঘন বাংলাদেশ যাত্রা, অবশ্যই এর অন্যতম কারণ আর তার সাথে রয়েছে একই ভাষায় কথা বলা মানুষদের আস্ত একটা দেশ নিয়ে নানান কৌতূহল। যারা আমার মতো জন্মসূত্রে বাঙাল অথচ কোনো সূত্রেই বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে ওঠেননি আর সেই ছোট্ট বেলা থেকে ও দেশ সম্বন্ধে গল্প শুনেছেন বিস্তর, তাঁদের আগ্রহ, ওঁদের কল্পনার তুলির ছবির সাথে আমার বাস্তবের অভিজ্ঞতা'কে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখা। দিনের শেষে বসে বা ছুটির আমেজ গায়ে মাখতে, মাখতে আমার অভিজ্ঞতা আরো অনেকের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ভাবনাটাকে আমল না দিয়ে তাই পারলামনা। দেখি ক'দিন চালাতে পারি এই আড্ডা।

যতবারই বাংলাদেশের বিমানে প্রবেশ করি, একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে। ছোট বেলায় দূর্গা পূজার সময় যখন দেশের বাড়ি যেতাম, খানিকটা সেরকম। দেবগ্রামের, তরফদার পাড়ায়, আমাদের বাড়ির দূর্গা মণ্ডপের সিঁড়িতে বসে থাকতেন ছোট ঠাকুরদা, বড় জ্যেঠু, সেজো জ্যেঠু, জ্যাঠতুতো, খুড়তোতো ভাই - বোনেরা - ট্রেনের সময় মিলিয়ে অপেক্ষা ঘরের মানুষদের আবার ঘরে খুঁজে পাওয়ার। সে এক অবর্ণনীয় উত্তেজনা। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের অত্যাধুনিক বানিয়েছে ঠিকই কিন্তু বেশ কিছু নির্মল উত্তেজনাকেও করে দিয়েছে মলিন। ঠিক সেই ছোট্ট বেলার উত্তেজনা এখনো টের পাই যতবার বাংলাদেশে যাই। ঠাকুরদা নেই, ঠাকুরদার ভিটে নেই, পরিচিত আত্মীয় স্বজন কেউ নেই - অথচ কি অমোঘ সেই 'বিচ্ছিন্ন' শিকড়ের টান।

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশে। তারপর যে কতবার গেছি আর ফিরেছি। ভিসার মেয়াদ দেখে, সময় মেপে থেকেছি। প্রত্যেক বার অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কাউন্টার এ গেলে বড়ো বিচিত্র লাগে - মনে হয় নিজের বাড়িতে বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার মতো। যে ভূখন্ডটা আমাদের সব্বার ছিল, কিছু মাতব্বর ধর্মের নাম দিয়ে মাঝ খানে কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করে দিলেন - আমাদের আর ওঁদের মধ্যে। সেই সব মাতব্বরদের কেউই আর আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চই চেষ্টা করতাম ওঁদের কাছে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করতে যে কত কর্তৃত্ব করার সুযোগ পেলে ওঁরা সাধারণ মানুষদের জীবন, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছেড়ে অন্য খেলায় মন দেবেন।

বাংলাদেশের জল-হাওয়ার এক বিরল গুন আছে - দূরের মানুষ কে কাছে টেনে নেওয়ার। সে দেশে না গেলে তার মাত্রা বোঝা যাবে না। তাদের আন্তরিকায় , আতিথেয়তায়, আপ্যায়নে চরম নিন্দুকেরাও খুঁত ধরতে পারবেন না। এমনি তার গভীরতা। ভারতের পর্যটন বিভাগের বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন 'অতিথি দেব ভব' অর্থাৎ অতিথি দেবতাতুল্য, সহজেই বাংলাদেশের পর্যটন বিভাগেরও ট্যাগ লাইন হতে পারতো। দেব - দেবীর উপাসকের সংখ্যা সে দেশে আনুপাতিক ভাবে যদিও অনেক কম কিন্তু সামগ্রিক অতিথি সেবা থেকে দেবত্বের অনুভূতি আসে অনায়াসে। ধর্ম - বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাংলাদেশী তাদের মনের উষ্ণতা দিয়ে মানুষকে এতটাই আপন করে নিতে জানেন যে, সেখানে আত্মীয়তা তৈরী হয় প্রতিটি মুহূর্তে। বাংলাদেশের সাথে ২০০৪ সালে তৈরী হওয়া আমার সেই আত্মীয়তা তাই আজও অমলিন - দিনে, দিনে শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যা কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১২.০৯.২০১৬