Wednesday, September 14, 2016

এক বাঙালের বাংলাদেশ - ১



আজকাল কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসলে, কথোপকথনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে বাংলাদেশ। কর্মসূত্রে আমার ঘন ঘন বাংলাদেশ যাত্রা, অবশ্যই এর অন্যতম কারণ আর তার সাথে রয়েছে একই ভাষায় কথা বলা মানুষদের আস্ত একটা দেশ নিয়ে নানান কৌতূহল। যারা আমার মতো জন্মসূত্রে বাঙাল অথচ কোনো সূত্রেই বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে ওঠেননি আর সেই ছোট্ট বেলা থেকে ও দেশ সম্বন্ধে গল্প শুনেছেন বিস্তর, তাঁদের আগ্রহ, ওঁদের কল্পনার তুলির ছবির সাথে আমার বাস্তবের অভিজ্ঞতা'কে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখা। দিনের শেষে বসে বা ছুটির আমেজ গায়ে মাখতে, মাখতে আমার অভিজ্ঞতা আরো অনেকের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ভাবনাটাকে আমল না দিয়ে তাই পারলামনা। দেখি ক'দিন চালাতে পারি এই আড্ডা।

যতবারই বাংলাদেশের বিমানে প্রবেশ করি, একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে। ছোট বেলায় দূর্গা পূজার সময় যখন দেশের বাড়ি যেতাম, খানিকটা সেরকম। দেবগ্রামের, তরফদার পাড়ায়, আমাদের বাড়ির দূর্গা মণ্ডপের সিঁড়িতে বসে থাকতেন ছোট ঠাকুরদা, বড় জ্যেঠু, সেজো জ্যেঠু, জ্যাঠতুতো, খুড়তোতো ভাই - বোনেরা - ট্রেনের সময় মিলিয়ে অপেক্ষা ঘরের মানুষদের আবার ঘরে খুঁজে পাওয়ার। সে এক অবর্ণনীয় উত্তেজনা। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের অত্যাধুনিক বানিয়েছে ঠিকই কিন্তু বেশ কিছু নির্মল উত্তেজনাকেও করে দিয়েছে মলিন। ঠিক সেই ছোট্ট বেলার উত্তেজনা এখনো টের পাই যতবার বাংলাদেশে যাই। ঠাকুরদা নেই, ঠাকুরদার ভিটে নেই, পরিচিত আত্মীয় স্বজন কেউ নেই - অথচ কি অমোঘ সেই 'বিচ্ছিন্ন' শিকড়ের টান।

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশে। তারপর যে কতবার গেছি আর ফিরেছি। ভিসার মেয়াদ দেখে, সময় মেপে থেকেছি। প্রত্যেক বার অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কাউন্টার এ গেলে বড়ো বিচিত্র লাগে - মনে হয় নিজের বাড়িতে বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার মতো। যে ভূখন্ডটা আমাদের সব্বার ছিল, কিছু মাতব্বর ধর্মের নাম দিয়ে মাঝ খানে কাঁটাতার দিয়ে আলাদা করে দিলেন - আমাদের আর ওঁদের মধ্যে। সেই সব মাতব্বরদের কেউই আর আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চই চেষ্টা করতাম ওঁদের কাছে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করতে যে কত কর্তৃত্ব করার সুযোগ পেলে ওঁরা সাধারণ মানুষদের জীবন, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছেড়ে অন্য খেলায় মন দেবেন।

বাংলাদেশের জল-হাওয়ার এক বিরল গুন আছে - দূরের মানুষ কে কাছে টেনে নেওয়ার। সে দেশে না গেলে তার মাত্রা বোঝা যাবে না। তাদের আন্তরিকায় , আতিথেয়তায়, আপ্যায়নে চরম নিন্দুকেরাও খুঁত ধরতে পারবেন না। এমনি তার গভীরতা। ভারতের পর্যটন বিভাগের বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন 'অতিথি দেব ভব' অর্থাৎ অতিথি দেবতাতুল্য, সহজেই বাংলাদেশের পর্যটন বিভাগেরও ট্যাগ লাইন হতে পারতো। দেব - দেবীর উপাসকের সংখ্যা সে দেশে আনুপাতিক ভাবে যদিও অনেক কম কিন্তু সামগ্রিক অতিথি সেবা থেকে দেবত্বের অনুভূতি আসে অনায়াসে। ধর্ম - বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাংলাদেশী তাদের মনের উষ্ণতা দিয়ে মানুষকে এতটাই আপন করে নিতে জানেন যে, সেখানে আত্মীয়তা তৈরী হয় প্রতিটি মুহূর্তে। বাংলাদেশের সাথে ২০০৪ সালে তৈরী হওয়া আমার সেই আত্মীয়তা তাই আজও অমলিন - দিনে, দিনে শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যা কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। (ক্রমশ)

প্রতীক তরফদার । ১২.০৯.২০১৬

No comments:

Post a Comment