Wednesday, April 15, 2026

নববর্ষের চিঠি - ১৪৩৩

 


কারো হালখাতার কথা মনে পড়ে? শৈশবে পয়লা বৈশাখের আমেজ শুরুই হতো এই হালখাতার নেমন্তন্নর চিঠি দিয়ে। যত বেশি চিঠি তত বেশি মিষ্টির বাক্স। সাথে আসতো বাংলা ক্যালেন্ডার, যার অধিকাংশই কাউকে না কাউকে দিয়ে দেওয়া হতো বা খোলাই হতো না। একটা ক্যালেন্ডার অবশ্যই স্থান পেতো রান্নাঘরে। মায়ের এখনো একখানা বাংলা ক্যালেন্ডার চাইই চাই। বাড়ির বাকি সদস্যদের এখন গ্রীষ্ম বা বর্ষা - গুগল ক্যালেন্ডারই ভরসা।  

আজকাল অবশ্য আর কোনো হালখাতার অনুষ্ঠানের চিঠি আসেনা। অনলাইন স্টোর, চেইন ফ্যাশন স্টোর বা চেইন সুপার শপের প্রতি নির্ভরশীলতাই সম্ভবত এর মূল কারণ। হালখাতার অনুষ্ঠান এখনো অনেক স্থানীয় দোকানই করেন তবে উদযাপনের চরিত্র বদলেছে। 

একদম ছোটো বেলা মাত্র সারে তিন মাসের ব্যবধানে দু খানা নতুন বছরের আগমনে একটু বিভ্রান্ত (confused) থাকতাম... একই পৃথিবীতে নানা প্রান্তে এতো রকমের আলাদা আলাদা ক্যালেন্ডারের দরকার নিয়ে মাথা গুবলেট হতো। অনেক পরে এর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট মাথায় ঢুকেছিলো। 

বাংলাদেশে গিয়ে বাংলা নতুন বছর বরণ করার আরেক নতুন দিক আমার জীবনে উন্মোচিত হয়েছিল। কাটাতারের এপারে বাংলা নতুন বছর অনেকটাই ধর্মীয় অনুষ্ঠান আর ওপারে সাংস্কৃতিক। সে দেশে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উদযাপনের সুযোগ অনেকটাই ভিন্ন হওয়ার কারণেই সম্ভবত বাংলা নববর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মাত্রার ব্যাপকতা বাড়ছে আর বদলাচ্ছে।  পারেও কিছু বদল আমার নজর এড়ায়নি। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের মঙ্গল শোভাযাত্রার (নাম বদলে এখন বৈশাখী শোভাযাত্রা) বিভিন্ন আর্ট মোটিফ এপারের নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তার বা অনুষ্ঠানের ক্রিয়েটিভে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। সৌজন্যে সোশ্যাল মিডিয়া। মঙ্গল ঘট, কলাগাছ, লক্ষ্মী-গণেশের জায়গায় স্থান পেয়েছে বিভিন্ন পাখি, পশু, মাছের মোটিফ। এই সাংস্কৃতিক আদান প্রদানে প্রযুক্তি এক দুর্দান্ত সেতুবন্ধনের কাজ করে। এই সুযোগ বলে রাখি, আমাদের পয়লা ওপারে পহেলা। 

বছরের প্রথম দিন একটু কব্জি ডুবিয়ে না খেলেই নয়। ভাব খানা এরকম যে এই দিনের সব আনন্দঘন মুহূর্তের আমেজ সারা বছর জুড়ে ছড়িয়ে যাবে। বাঙালির এই বারো মাসে তেরো পার্বণের চক্করেই আমার রোগা হওয়া হচ্ছেনা। নাহলে কবে সিক্স প্যাক হয়ে যেতো!  

পয়লা বৈশাখে অবশ্যই বরাদ্দ থাকতো কোনো না কোনো জামাকাপড়। আমাদের মধ্যবিত্ত শৈশবে পুজোতে পেতাম বাইরে পরবার মতো ভালো জামা-প্যান্ট আর পয়লা বৈশাখে নতুন কিছু পরার জন্য মূলত কেনা হতো ঘরে পরার গেঞ্জি অথবা বারমুডা। এবছরও একটা বারমুডা প্রাপ্তি হয়েছে। 

নববর্ষ মানেই খবরের কাগজের বিশেষ ক্রোড়পত্র (supplement) একটু বড় হবার পর থেকেই এইদিন বাজারের সব নামি দামি পত্রিকা নিয়ে আসার একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। কিছু অভ্যাস বদলায় না। এখনো তাই নতুন বছর এলে লিখতে বসে যাই। আমার অগ্রজদের সশ্রদ্ধ প্রণাম আর বাকি সবাইকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। 

সবার মঙ্গল হোক। 

শ্রদ্ধাসহ.... 

পয়লা বৈশাখ, ১৪৩৩

 

No comments:

Post a Comment